অধ্যায় ২ : পুরনো ছায়া
পর্ব ১ : আগন্তুক
বৃষ্টি হয়নি, কিন্তু আকাশে বৃষ্টির গন্ধ ছিল। বর্ষাকালের কিছু সকাল এমন হয়—মেঘ নেই, রোদও আছে, অথচ বাতাসে ভেজা মাটির একটা চাপা আভাস থেকে যায়। শান্তিকুঞ্জের সামনের বাগানে রঙ্গনের লাল ফুলগুলো রোদের আলোয় ঝলমল করছিল। গতকালের ঘটনাটা নিয়ে বাড়ির কেউ আর বিশেষ ভাবেনি। কালো SUV, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা, ঋত্বিকের মন্তব্য—সবই যেন দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য তুচ্ছ ঘটনার মধ্যে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে।
শুধু একজন বাদে।
অরিন্দম।
তিনি অবশ্য বাইরে থেকে সেটা বোঝার কোনো সুযোগ দেননি। সকালে যথারীতি চা খেয়েছেন, অমলেন্দুর সঙ্গে খবরের কাগজের একটা রাজনৈতিক খবর নিয়ে তর্কও করেছেন, এমনকি ঋত্বিকের গণিত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে দু-একটা রসিকতাও করেছেন। কিন্তু তাঁর ভেতরের একটা অংশ যেন অন্য কোথাও ব্যস্ত ছিল। মাঝে মাঝেই তিনি অজান্তে জানালার বাইরে তাকিয়ে যাচ্ছিলেন।
মেঘলা সেটা লক্ষ করেছিলেন।
দীর্ঘ পঁচিশ বছরের সংসারে তিনি শিখেছেন, অরিন্দম যখন চুপচাপ থাকে তখন তার মানে এই নয় যে মানুষটা নিশ্চিন্ত। বরং উল্টোটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সকালের নাস্তার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— কিছু হয়েছে?
অরিন্দম খবরের কাগজ ভাঁজ করতে করতে তাকালেন।
— কেন?
— তুমি আজ একটু অন্যরকম।
— আমি তো প্রতিদিনই অন্যরকম।
— এই বয়সে এসে flirting করলে কিন্তু কাজ হবে না।
অরিন্দম হেসে ফেললেন।
— চেষ্টা করতে দোষ কী?
মেঘলাও হেসে মাথা নাড়লেন। কিন্তু তাঁর চোখের কোণের উদ্বেগ পুরোপুরি মিলিয়ে গেল না।
সাড়ে দশটার দিকে কলিংবেল বেজে উঠল।
ঈশা তখন নিজের ঘরে ছবি এডিট করছিল। ঋত্বিক অনিচ্ছাসত্ত্বেও পড়তে বসেছে। মেঘলা রান্নাঘরে।
দরজা খুলতে গিয়ে অরিন্দম প্রথমে মানুষটাকে চিনতে পারেননি।
দাড়ি বেড়েছে।
চুলে পাক ধরেছে।
চোখের নীচে ক্লান্তির ছাপ।
কিন্তু লোকটা যখন মৃদু হেসে বলল, "ভিতরে ঢুকতে দেবি, নাকি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব?", তখন আর ভুল হওয়ার উপায় রইল না।
সমর মুখার্জি।
প্রায় ছয় ফুট লম্বা মানুষটা একসময় পুলিশের স্পেশাল অপারেশন ইউনিটের অন্যতম সেরা অফিসার ছিল। এখন অবসর নিয়েছে, কিন্তু তার চোখদুটো এখনও আগের মতোই সতর্ক। যেন চারপাশের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নড়াচড়া আলাদা করে বিশ্লেষণ করে দেখছে।
— ফোন করতে পারতে।
— করলে তুই না বলতে পারতিস।
— এখনও পারি।
— কিন্তু বলছিস না।
দুজনেই হেসে উঠল।
মেঘলা ড্রয়িংরুমে এসে সমরকে দেখে অবাক হলেন না, বরং এমনভাবে বললেন, "অবশেষে পথ ভুলে এদিকে এলেন?" যেন তিনি গতকালই এসেছিলেন।
সমর হেসে বলল,
— ভাবলাম বউদি এখনও আমাকে চা খাওয়ান কি না দেখে যাই।
— চা পাবেন। তবে তার আগে শুনব এতদিন কোথায় ছিলেন।
— সেটার উত্তর দিতে গেলে দুপুর হয়ে যাবে।
— তাতে সমস্যা নেই।
ঈশা সিঁড়ির মাথা থেকে দৃশ্যটা দেখছিল। সমর কাকুকে সে ছোটবেলা থেকে চেনে। কিন্তু গত কয়েক বছরে লোকটাকে খুব কমই দেখা গেছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সমর যখনই আসে, বাবার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা যায়। বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না, কিন্তু ঈশার মনে হয় দুজন মানুষ যেন এমন কোনো ভাষায় কথা বলে যা বাকিরা বুঝতে পারে না।
দুপুরের খানিক পরে অরিন্দম আর সমর বাড়ির পেছনের পুরনো আমগাছটার নীচে এসে বসল। জায়গাটা বাড়ির অন্য অংশ থেকে খানিকটা আড়ালে। কুমুদিনী অবশ্য দূর থেকে একবার দেখে নিয়ে গেছেন যে দুজনের সামনে চা আছে কি না। তারপর নিশ্চিন্ত হয়েছেন।
কিছুক্ষণ সাধারণ কথাবার্তা চলল। শরীরের খবর, পুরনো পরিচিতদের খবর, অবসরজীবনের একঘেয়েমি—এসব।
তারপর সমর ধীরে ধীরে বলল,
— আমি গত সপ্তাহে দিল্লি গিয়েছিলাম।
অরিন্দম চুপ রইলেন।
— একটা নাম আবার সামনে এসেছে।
— কোন নাম?
সমর সরাসরি উত্তর দিল না। পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে এগিয়ে দিল।
অরিন্দম কাগজটা খুললেন।
সেখানে মাত্র একটা শব্দ লেখা।
"চায়া"
কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা হলো না।
বাতাসে আমপাতা নড়ল।
দূরে কোথাও একটা কাক ডাকল।
অরিন্দমের মুখের অভিব্যক্তি খুব বেশি বদলাল না, কিন্তু সমর বুঝতে পারল, শব্দটা তার কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলেছে।
— নিশ্চিত?
— পুরোপুরি না।
— সূত্র?
— দুটো আলাদা সূত্র। দুজন দুজায়গা থেকে একই নাম বলেছে।
অরিন্দম কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলে রাখলেন। তাঁর চোখ এখন অনেক দূরে, যেন বর্তমানকে ভেদ করে বহু বছর আগের কোনো দৃশ্য দেখছে।
— আমরা ভেবেছিলাম ব্যাপারটা শেষ।
— আমরাও অনেক কিছু ভেবেছিলাম।
— আর SUV?
— সম্ভবত সম্পর্ক আছে।
— সম্ভবত?
— এখনও প্রমাণ নেই।
দুজনেই চুপ করে গেল।
নীরবতাটা অস্বস্তিকর ছিল না। বরং বহু বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া একটা নীরবতা। যেখানে শব্দের চেয়ে তথ্যের ওজন বেশি।
সমর অবশেষে বলল,
— যদি ওরা সত্যিই ফিরে এসে থাকে, তাহলে এবার ব্যাপারটা অন্যরকম হবে।
— জানি।
— আর তোর পরিবার...
বাকিটা বলল না।
বলতে হলো না।
অরিন্দমও উত্তর দিলেন না।
কারণ দুজনেই জানত, বাকিটা কী।
সন্ধ্যার দিকে সমর চলে গেল। গেটের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একবার পিছন ফিরে বাড়িটার দিকে তাকাল। শান্ত, সুন্দর, নিরীহ একটা বাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে কেউ কখনও বুঝবে না এই বাড়ির সঙ্গে কতগুলো অসমাপ্ত হিসাব জড়িয়ে আছে।
ভেতরে ফিরে এসে অরিন্দম সোজা স্টাডি রুমে গেলেন। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
বাগানে বাতাস লেগেছে।
রঙ্গনের লাল ফুলগুলো দুলছে।
সবকিছু আগের মতোই।
কিন্তু তাঁর হাতে এখনও ভাঁজ করা কাগজটা।
আর সেই কাগজে লেখা একটা মাত্র শব্দ।
চায়া।
যে নামটাকে তিনি বহু বছর ধরে কবর দিয়ে রেখেছেন বলে বিশ্বাস করেছিলেন।