Showing posts with label ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ. Show all posts
Showing posts with label ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ. Show all posts

ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ - পর্ব ৬

 অধ্যায় ২ : পুরনো ছায়া

পর্ব ১ : আগন্তুক

বৃষ্টি হয়নি, কিন্তু আকাশে বৃষ্টির গন্ধ ছিল। বর্ষাকালের কিছু সকাল এমন হয়—মেঘ নেই, রোদও আছে, অথচ বাতাসে ভেজা মাটির একটা চাপা আভাস থেকে যায়। শান্তিকুঞ্জের সামনের বাগানে রঙ্গনের লাল ফুলগুলো রোদের আলোয় ঝলমল করছিল। গতকালের ঘটনাটা নিয়ে বাড়ির কেউ আর বিশেষ ভাবেনি। কালো SUV, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা, ঋত্বিকের মন্তব্য—সবই যেন দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য তুচ্ছ ঘটনার মধ্যে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে।

শুধু একজন বাদে।

অরিন্দম।

তিনি অবশ্য বাইরে থেকে সেটা বোঝার কোনো সুযোগ দেননি। সকালে যথারীতি চা খেয়েছেন, অমলেন্দুর সঙ্গে খবরের কাগজের একটা রাজনৈতিক খবর নিয়ে তর্কও করেছেন, এমনকি ঋত্বিকের গণিত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে দু-একটা রসিকতাও করেছেন। কিন্তু তাঁর ভেতরের একটা অংশ যেন অন্য কোথাও ব্যস্ত ছিল। মাঝে মাঝেই তিনি অজান্তে জানালার বাইরে তাকিয়ে যাচ্ছিলেন।

মেঘলা সেটা লক্ষ করেছিলেন।

দীর্ঘ পঁচিশ বছরের সংসারে তিনি শিখেছেন, অরিন্দম যখন চুপচাপ থাকে তখন তার মানে এই নয় যে মানুষটা নিশ্চিন্ত। বরং উল্টোটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

সকালের নাস্তার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

— কিছু হয়েছে?

অরিন্দম খবরের কাগজ ভাঁজ করতে করতে তাকালেন।

— কেন?

— তুমি আজ একটু অন্যরকম।

— আমি তো প্রতিদিনই অন্যরকম।

— এই বয়সে এসে flirting করলে কিন্তু কাজ হবে না।

অরিন্দম হেসে ফেললেন।

— চেষ্টা করতে দোষ কী?

মেঘলাও হেসে মাথা নাড়লেন। কিন্তু তাঁর চোখের কোণের উদ্বেগ পুরোপুরি মিলিয়ে গেল না।

সাড়ে দশটার দিকে কলিংবেল বেজে উঠল।

ঈশা তখন নিজের ঘরে ছবি এডিট করছিল। ঋত্বিক অনিচ্ছাসত্ত্বেও পড়তে বসেছে। মেঘলা রান্নাঘরে।

দরজা খুলতে গিয়ে অরিন্দম প্রথমে মানুষটাকে চিনতে পারেননি।

দাড়ি বেড়েছে।

চুলে পাক ধরেছে।

চোখের নীচে ক্লান্তির ছাপ।

কিন্তু লোকটা যখন মৃদু হেসে বলল, "ভিতরে ঢুকতে দেবি, নাকি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব?", তখন আর ভুল হওয়ার উপায় রইল না।

সমর মুখার্জি।

প্রায় ছয় ফুট লম্বা মানুষটা একসময় পুলিশের স্পেশাল অপারেশন ইউনিটের অন্যতম সেরা অফিসার ছিল। এখন অবসর নিয়েছে, কিন্তু তার চোখদুটো এখনও আগের মতোই সতর্ক। যেন চারপাশের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নড়াচড়া আলাদা করে বিশ্লেষণ করে দেখছে।

— ফোন করতে পারতে।

— করলে তুই না বলতে পারতিস।

— এখনও পারি।

— কিন্তু বলছিস না।

দুজনেই হেসে উঠল।

মেঘলা ড্রয়িংরুমে এসে সমরকে দেখে অবাক হলেন না, বরং এমনভাবে বললেন, "অবশেষে পথ ভুলে এদিকে এলেন?" যেন তিনি গতকালই এসেছিলেন।

সমর হেসে বলল,

— ভাবলাম বউদি এখনও আমাকে চা খাওয়ান কি না দেখে যাই।

— চা পাবেন। তবে তার আগে শুনব এতদিন কোথায় ছিলেন।

— সেটার উত্তর দিতে গেলে দুপুর হয়ে যাবে।

— তাতে সমস্যা নেই।

ঈশা সিঁড়ির মাথা থেকে দৃশ্যটা দেখছিল। সমর কাকুকে সে ছোটবেলা থেকে চেনে। কিন্তু গত কয়েক বছরে লোকটাকে খুব কমই দেখা গেছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সমর যখনই আসে, বাবার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা যায়। বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না, কিন্তু ঈশার মনে হয় দুজন মানুষ যেন এমন কোনো ভাষায় কথা বলে যা বাকিরা বুঝতে পারে না।

দুপুরের খানিক পরে অরিন্দম আর সমর বাড়ির পেছনের পুরনো আমগাছটার নীচে এসে বসল। জায়গাটা বাড়ির অন্য অংশ থেকে খানিকটা আড়ালে। কুমুদিনী অবশ্য দূর থেকে একবার দেখে নিয়ে গেছেন যে দুজনের সামনে চা আছে কি না। তারপর নিশ্চিন্ত হয়েছেন।

কিছুক্ষণ সাধারণ কথাবার্তা চলল। শরীরের খবর, পুরনো পরিচিতদের খবর, অবসরজীবনের একঘেয়েমি—এসব।

তারপর সমর ধীরে ধীরে বলল,

— আমি গত সপ্তাহে দিল্লি গিয়েছিলাম।

অরিন্দম চুপ রইলেন।

— একটা নাম আবার সামনে এসেছে।

— কোন নাম?

সমর সরাসরি উত্তর দিল না। পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে এগিয়ে দিল।

অরিন্দম কাগজটা খুললেন।

সেখানে মাত্র একটা শব্দ লেখা।

"চায়া"

কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা হলো না।

বাতাসে আমপাতা নড়ল।

দূরে কোথাও একটা কাক ডাকল।

অরিন্দমের মুখের অভিব্যক্তি খুব বেশি বদলাল না, কিন্তু সমর বুঝতে পারল, শব্দটা তার কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলেছে।

— নিশ্চিত?

— পুরোপুরি না।

— সূত্র?

— দুটো আলাদা সূত্র। দুজন দুজায়গা থেকে একই নাম বলেছে।

অরিন্দম কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলে রাখলেন। তাঁর চোখ এখন অনেক দূরে, যেন বর্তমানকে ভেদ করে বহু বছর আগের কোনো দৃশ্য দেখছে।

— আমরা ভেবেছিলাম ব্যাপারটা শেষ।

— আমরাও অনেক কিছু ভেবেছিলাম।

— আর SUV?

— সম্ভবত সম্পর্ক আছে।

— সম্ভবত?

— এখনও প্রমাণ নেই।

দুজনেই চুপ করে গেল।

নীরবতাটা অস্বস্তিকর ছিল না। বরং বহু বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া একটা নীরবতা। যেখানে শব্দের চেয়ে তথ্যের ওজন বেশি।

সমর অবশেষে বলল,

— যদি ওরা সত্যিই ফিরে এসে থাকে, তাহলে এবার ব্যাপারটা অন্যরকম হবে।

— জানি।

— আর তোর পরিবার...

বাকিটা বলল না।

বলতে হলো না।

অরিন্দমও উত্তর দিলেন না।

কারণ দুজনেই জানত, বাকিটা কী।

সন্ধ্যার দিকে সমর চলে গেল। গেটের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একবার পিছন ফিরে বাড়িটার দিকে তাকাল। শান্ত, সুন্দর, নিরীহ একটা বাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে কেউ কখনও বুঝবে না এই বাড়ির সঙ্গে কতগুলো অসমাপ্ত হিসাব জড়িয়ে আছে।

ভেতরে ফিরে এসে অরিন্দম সোজা স্টাডি রুমে গেলেন। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

বাগানে বাতাস লেগেছে।

রঙ্গনের লাল ফুলগুলো দুলছে।

সবকিছু আগের মতোই।

কিন্তু তাঁর হাতে এখনও ভাঁজ করা কাগজটা।

আর সেই কাগজে লেখা একটা মাত্র শব্দ।

চায়া।

যে নামটাকে তিনি বহু বছর ধরে কবর দিয়ে রেখেছেন বলে বিশ্বাস করেছিলেন।

ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ - ৪

 অধ্যায় ১ : শান্তিকুঞ্জ

পর্ব ৪ : সন্ধ্যার আলো

সন্ধ্যা নামার নিজস্ব একটা ছন্দ আছে। দিনের কোলাহল ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে, বাড়ির ভেতর আলো জ্বলে ওঠে, আর মানুষ অজান্তেই দিনের ব্যস্ততা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করে। সেনবাড়িতেও প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যা নেমেছে। নীচতলার পূজার ঘরে কুমুদিনী প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন। প্রদীপের ছোট্ট শিখা তাঁর মুখে এক ধরনের প্রশান্ত আভা এনে দিয়েছে। ধূপের গন্ধ বাড়ির ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে, আর সেই পরিচিত গন্ধের সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে বহু বছরের অভ্যাস, স্মৃতি আর নিরাপত্তার অনুভূতি।

ড্রয়িংরুমে অমলেন্দু সেন খবরের কাগজ খুলে বসে আছেন। খবর পড়ার চেয়ে খবরের সমালোচনা করতেই তিনি যেন বেশি আনন্দ পান। কিছুক্ষণ পরপর চশমা নাকের ডগায় নামিয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করছেন। দেশের অবস্থা কোথায় যাচ্ছে, বর্তমান প্রজন্ম কী ভুল করছে, আর সম্পাদকরা কেন ঠিকমতো লেখেন না—এই তিনটি বিষয় নিয়ে তিনি প্রায় প্রতিদিনই নতুন করে উদ্বিগ্ন হন।

দোতলায় নিজের ঘরে ঋত্বিক হেডফোন পরে কম্পিউটারের সামনে বসে আছে। ঘরের দরজা আধখোলা, আর সেখান থেকে মাঝে মাঝেই তার উত্তেজিত গলা ভেসে আসছে।

— আরে! Left side! Left side!

কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার প্রতিবাদ।

— না, এটা cheating!

নিচে বসে থাকা অমলেন্দু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— এরা যুদ্ধও করে, আবার নিজেরাই নিয়ম বানায়।

কুমুদিনী দূর থেকে উত্তর দিলেন,

— তোমাদের সময়েও কি আলাদা কিছু ছিল?

অমলেন্দু কাশির ভান করলেন। উত্তর দেওয়াটাকে তিনি সমীচীন মনে করলেন না।

এদিকে নিজের ঘরে বসে ঈশা আবার সেই পুরনো বাড়ির ছবিটা দেখছিল। বিকেলে তোলা ছবিগুলো সে ইতিমধ্যে কয়েকবার ঘেঁটেছে, কিন্তু ওই একটা ছবির কাছেই বারবার ফিরে আসছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে জানালার অংশটুকু বড় করে রেখেছে। যতবার জুম করছে, ততবার মনে হচ্ছে ভেতরে কিছু একটা আছে। আবার পরের মুহূর্তেই মনে হচ্ছে সেটা হয়তো আলো-ছায়ার খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।

সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। নিজের ওপরই একটু বিরক্ত লাগছিল।

একটা ছবি নিয়ে এত ভাবার কী আছে?

অনন্যা থাকলে এতক্ষণে অন্তত পাঁচবার ভূতের তত্ত্ব দিয়ে ফেলত। সেই চিন্তায় ঈশার মুখে হালকা হাসি ফুটল। কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ টিকল না। কারণ অদ্ভুতভাবে তার মনে হচ্ছিল, ছবিটার মধ্যে এমন কিছু আছে যা সে এখনও ধরতে পারেনি।

অবশেষে ল্যাপটপটা বন্ধ করে সে উঠে দাঁড়াল।

— Enough. আজ আর না।

কথাটা নিজের উদ্দেশেই বলা।

দোতলার সামনের বারান্দায় বসে ছিলেন অরিন্দম। সন্ধ্যার আলো প্রায় মিলিয়ে গেছে। দূরের রাস্তার লাইটগুলো জ্বলে উঠেছে, আর ভেজা বাতাসে কোথাও থেকে রাতের ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। তাঁর সামনে রাখা চায়ের কাপটা প্রায় ঠান্ডা হয়ে গেছে। আজ অদ্ভুতভাবে মনটা স্থির হচ্ছে না।

গত কয়েক বছরে তিনি নিজের জীবনকে নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছেন। পরিবার, বাড়ি, নিত্যদিনের ছোটখাটো ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে অতীত যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। অন্তত তিনি তাই ভেবেছিলেন।

ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি পরিচিত নাম।

সমর।

অরিন্দম কল রিসিভ করলেন।

— বল।

ওপাশে সঙ্গে সঙ্গে পরিচিত হাসির শব্দ শোনা গেল।

— বাহ। এতদিন পরেও অভ্যর্থনা বদলায়নি।

— নাটক কম কর।

— চেষ্টা করি। পারি না।

অরিন্দমের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। সমর মুখার্জীর এই স্বভাবটা বহু বছরের পুরনো। পরিস্থিতি যতই গুরুতর হোক, কথার শুরুটা সে কখনও গম্ভীরভাবে করতে পারে না।

কিছুক্ষণ সাধারণ কথাবার্তা চলল। বাড়ির খবর, শরীরের খবর, পুরনো পরিচিতদের খবর। কিন্তু কথার ফাঁকেই অরিন্দম বুঝতে পারলেন, সমর আসলে অন্য কোনো কারণে ফোন করেছে। তার গলায় এমন একটা চাপা সতর্কতা ছিল, যেটা তিনি খুব ভালো করেই চেনেন।

একসময় সমর নিজেই প্রসঙ্গটা তুলল।

— আজ একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে।

— তারপর?

— একটা নাম শুনলাম।

অরিন্দম কিছু বললেন না। বারান্দার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। অনেক বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, কিছু কথা তাড়াহুড়ো করে বলা যায় না।

ওপাশে সমরও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

— নামটা প্রায় পাঁচ বছর শুনিনি।

এইবার অরিন্দমের আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে উঠল। বাতাস আগের মতোই বইছিল, কিন্তু তাঁর মনে হলো চারপাশের শব্দগুলো যেন দূরে সরে গেছে।

— নিশ্চিত?

— আমি নিশ্চিত না হলে ফোন করতাম না।

— উৎস?

— নির্ভরযোগ্য।

অরিন্দম ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন। একটা পুরনো স্মৃতি যেন মনের অন্ধকার কোণ থেকে উঠে এল। বহুদিন ধরে তিনি সেই স্মৃতিগুলোকে স্পর্শ করেননি।

— আর কিছু?

— আপাতত না। তবে নজর রাখছি।

— রাখো।

আবার কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর সমর নিচু গলায় বলল,

— যদি খবরটা সত্যি হয়, তাহলে...

বাকিটা শেষ করার প্রয়োজন ছিল না।

দুজনেই জানত, অসমাপ্ত বাক্যের শেষে কী শব্দ লুকিয়ে আছে।

কল কেটে যাওয়ার পরও অরিন্দম কিছুক্ষণ একইভাবে বসে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে স্টাডি রুমের দিকে গেলেন।

ঘরটার দরজা বন্ধ করে তিনি টেবিলের পাশে দাঁড়ালেন। কাঠের পুরনো ড্রয়ারটা খুলতেই পরিচিত কিছু জিনিস চোখে পড়ল—ফাইল, নোটবুক, কয়েকটি বিবর্ণ ফটোগ্রাফ। এক কোণে কালো কাপড়ে মোড়া একটি বস্তু রাখা।

অনেকদিন ধরে তিনি এটাকে স্পর্শ করেননি।

তবু প্রতিবার দেখলেই মনে হয়, সময়টা খুব বেশি দূরের নয়।

কাপড়টা সরানোর প্রয়োজন হলো না। ভেতরে কী আছে, তিনি খুব ভালো করেই জানেন।

কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তিনি ড্রয়ারটা আবার বন্ধ করে দিলেন। তারপর ঘরের আলো নিভিয়ে বেরিয়ে এলেন, যেন কোনো পুরনো স্মৃতিকে আবার অন্ধকারের মধ্যে রেখে এলেন।

রাত বাড়তে বাড়তে বাড়িটা শান্ত হয়ে গেল। ঋত্বিকের ঘর নিস্তব্ধ। ঈশার ঘরের আলোও নিভে গেছে। অমলেন্দু ও কুমুদিনী নিজেদের ঘরে। মেঘলা বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছেন।

শুধু অরিন্দমের ঘুম এল না।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। দূরে একটা কুকুর ডেকে উঠল, তারপর আবার সব শান্ত। তাঁর মাথার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই একটি কথাই।

পাঁচ বছর।

পাঁচ বছর ধরে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়টা শেষ হয়ে গেছে। অতীতের দরজা বন্ধ হয়েছে। আর ফিরে তাকানোর প্রয়োজন নেই।

কিন্তু সেদিন রাতে প্রথমবার তাঁর মনে হলো, কিছু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করা গেলেও ভেতর থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয় না।

হয়তো কিছু যুদ্ধ সত্যিই শেষ হয় না।

তারা শুধু অন্ধকারে অপেক্ষা করে।

ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ - ৩

 অধ্যায় ১ : শান্তিকুঞ্জ

পর্ব ৩ : ঈশার পৃথিবী

দুপুরের রোদটা সেদিন অদ্ভুত ছিল।

সকালের মেঘ কেটে গেলেও আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। কোথাও কোথাও ধূসর মেঘের ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে, আবার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা সূর্যের আলো ভেজা পাতার ওপর পড়ে ঝিলমিল করছে। শহরের পুরনো কলেজ রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঈশা ক্যামেরাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে হাতে নিল।

তার অভ্যাস আছে।

অনেকেই দৃশ্য দেখে।

ঈশা ফ্রেম দেখে।

রাস্তার ধারে দাঁড়ানো চায়ের দোকানের বুড়ো লোকটা কাচের গ্লাস ধুচ্ছে। দূরে একটা রিকশা বৃষ্টির জলে তৈরি হওয়া ছোট্ট গর্ত এড়িয়ে যাচ্ছে। একটা কালো কুকুর রোদের টুকরোর মধ্যে গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে।

মানুষের কাছে এগুলো সাধারণ দৃশ্য।

ঈশার কাছে নয়।

সে হাঁটু গেড়ে বসে ক্যামেরা তুলল।

ক্লিক।

স্ক্রিনে ছবিটা ভেসে উঠতেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।

— Not bad.

পাশ থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল।

— তুই একদিন কুকুর-বিড়ালের official photographer হয়ে যাবি।

ঈশা মাথা তুলে তাকাল।

অনন্যা।

কলেজে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। মাঝারি উচ্চতা, কোঁকড়ানো চুল, মুখে সবসময় এমন অভিব্যক্তি যেন পৃথিবীর সব নাটক তার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে।

— এটা artistic photograph।

— হ্যাঁ, অবশ্যই। একটা ঘুমন্ত কুকুর। বিশ্বসংস্কৃতিতে বিরাট অবদান।

— তুই বুঝবি না।

— আমি চেষ্টা করছি না।

দুজনেই হেসে ফেলল।

কলেজ ছুটি হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। তবু তারা বাড়ি ফেরেনি। এই শহরের পুরনো অংশটায় ঘুরে বেড়াতে ঈশার ভালো লাগে।

এখানে সময় একটু ধীরে চলে।

পুরনো দোকান, পুরনো বাড়ি, পুরনো মানুষ।

আর পুরনো গল্প।

বিশেষ করে গল্প।

একটা সরু গলির মুখে পৌঁছে ঈশা থেমে গেল।

গলিটার শেষে একটা ভাঙাচোরা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। লোহার গেট মরচে পড়ে প্রায় লাল হয়ে গেছে। জানালার কাচের অর্ধেক ভাঙা।

অনন্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— আবার?

— কী আবার?

— তোর ওই haunted house obsession।

— Haunted না।

— অবশ্যই haunted।

— বৈজ্ঞানিকভাবে—

— চুপ।

ঈশা হাসল।

এই নিয়ে তাদের বহুদিনের তর্ক।

ঈশা রহস্য খোঁজে।

অনন্যা রহস্য এড়িয়ে চলে।

তবু শেষ পর্যন্ত রহস্যের পিছনে তাকেই টেনে নিয়ে যেতে হয়।

গলির দিকে তাকিয়ে ঈশা বলল,

— বাড়িটার একটা ছবি নেব।

— তারপর?

— তারপর কিছু না।

— তুই যখন বলিস "কিছু না", তখনই আমার সবচেয়ে ভয় করে।

ঈশা কোনো উত্তর দিল না।

ক্যামেরা তুলল।

ভিউফাইন্ডারের মধ্যে বাড়িটা আরও অন্যরকম দেখাচ্ছিল।

নিঃসঙ্গ।

নীরব।

অপেক্ষমাণ।

ক্লিক।

ছবি তোলার ঠিক পরেই তার চোখে একটা জিনিস ধরা পড়ল।

দ্বিতীয় তলার একটা জানালা।

মুহূর্তের জন্য মনে হলো সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।

খুব ক্ষণিকের জন্য।

তারপর নেই।

ঈশা ভুরু কুঁচকাল।

— কী হলো?

অনন্যা জিজ্ঞেস করল।

— কিছু না।

— নিশ্চিত?

— হয়তো চোখের ভুল।

তবু সে আরও একবার তাকাল।

জানালাটা এখন খালি।

হাওয়ায় ভাঙা পর্দার একটা অংশ নড়ছে।

আর কিছু না।

বিকেল চারটার দিকে ঈশা বাড়ি ফিরল।

ফটক খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেল কুমুদিনী বাগানে কাজ করছেন।

— এলি?

— হ্যাঁ ঠাম্মা।

— খেয়েছিস কিছু?

— না।

— বুঝেছি।

ঈশা হেসে ফেলল।

বাড়ির সবাই জানে, ক্যামেরা হাতে বেরোলে খাওয়ার কথা তার মাথা থেকে উধাও হয়ে যায়।

কুমুদিনী গাছের টব থেকে হাত সরিয়ে বললেন,

— তোর বাবা স্টাডি রুমে।

— কেন?

— জানি না। দুপুরে একজন এসেছিল।

ঈশা একটু অবাক হলো।

— কে?

— নাম শুনিনি।

— অফিসের কেউ?

— হতে পারে।

ঈশা মাথা নাড়ল।

বিশেষ গুরুত্ব দিল না।

কিন্তু কথাটা তার মাথায় থেকে গেল।

কারণ অরিন্দমের পুরনো সহকর্মীরা এখনও মাঝেমধ্যে আসে। তবে বেশিরভাগ সময়ই তারা সন্ধ্যার পর আসে।

দুপুরে খুব কম।

সে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।

স্টাডি রুমের দরজা বন্ধ।

ভেতর থেকে কোনো শব্দও আসছে না।

এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো দরজায় নক করতে।

কিন্তু করল না।

বাবার কিছু কিছু সময় থাকে, যখন তাকে একা থাকতে দেওয়াই ভালো।

এটা সে ছোটবেলা থেকেই শিখেছে।

সন্ধ্যার একটু আগে নিজের ঘরে বসে ছবিগুলো কম্পিউটারে ট্রান্সফার করছিল ঈশা।



একটার পর একটা ছবি স্ক্রিনে উঠছে।

কুকুর।

রিকশা।

চায়ের দোকান।

পুরনো বাড়ি।

হঠাৎ সে থেমে গেল।

ভাঙা বাড়িটার ছবিটা স্ক্রিনে বড় করে খুলল।

জুম করল।

আরও একটু।

আরও।

তারপর ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল।

দ্বিতীয় তলার জানালার ভেতরে কিছু একটা আছে।

মানুষ?

ছায়া?

নাকি আলো-ছায়ার খেলা?

নিশ্চিতভাবে বোঝা যাচ্ছে না।

তবু কিছু একটা আছে।

অনন্যাকে পাঠালে সে অবশ্য এক সেকেন্ডের মধ্যে ভূত ঘোষণা করে দেবে।

ঈশা মৃদু হাসল।

তারপর আবার ছবিটার দিকে তাকাল।

হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

কারণ এবার তার মনে হলো—

জানালার ভেতরের অস্পষ্ট অবয়বটা যেন সরাসরি ক্যামেরার দিকেই তাকিয়ে আছে।

ঠিক তার দিকে।

ঘরের বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। দূরে কোথাও প্রথম ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।

আর ঈশা বুঝতে পারল না, কেন ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার শরীরের ভেতর দিয়ে হালকা একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।