ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ - ৪

 অধ্যায় ১ : শান্তিকুঞ্জ

পর্ব ৪ : সন্ধ্যার আলো

সন্ধ্যা নামার নিজস্ব একটা ছন্দ আছে। দিনের কোলাহল ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে, বাড়ির ভেতর আলো জ্বলে ওঠে, আর মানুষ অজান্তেই দিনের ব্যস্ততা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করে। সেনবাড়িতেও প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যা নেমেছে। নীচতলার পূজার ঘরে কুমুদিনী প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন। প্রদীপের ছোট্ট শিখা তাঁর মুখে এক ধরনের প্রশান্ত আভা এনে দিয়েছে। ধূপের গন্ধ বাড়ির ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে, আর সেই পরিচিত গন্ধের সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে বহু বছরের অভ্যাস, স্মৃতি আর নিরাপত্তার অনুভূতি।

ড্রয়িংরুমে অমলেন্দু সেন খবরের কাগজ খুলে বসে আছেন। খবর পড়ার চেয়ে খবরের সমালোচনা করতেই তিনি যেন বেশি আনন্দ পান। কিছুক্ষণ পরপর চশমা নাকের ডগায় নামিয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করছেন। দেশের অবস্থা কোথায় যাচ্ছে, বর্তমান প্রজন্ম কী ভুল করছে, আর সম্পাদকরা কেন ঠিকমতো লেখেন না—এই তিনটি বিষয় নিয়ে তিনি প্রায় প্রতিদিনই নতুন করে উদ্বিগ্ন হন।

দোতলায় নিজের ঘরে ঋত্বিক হেডফোন পরে কম্পিউটারের সামনে বসে আছে। ঘরের দরজা আধখোলা, আর সেখান থেকে মাঝে মাঝেই তার উত্তেজিত গলা ভেসে আসছে।

— আরে! Left side! Left side!

কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার প্রতিবাদ।

— না, এটা cheating!

নিচে বসে থাকা অমলেন্দু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— এরা যুদ্ধও করে, আবার নিজেরাই নিয়ম বানায়।

কুমুদিনী দূর থেকে উত্তর দিলেন,

— তোমাদের সময়েও কি আলাদা কিছু ছিল?

অমলেন্দু কাশির ভান করলেন। উত্তর দেওয়াটাকে তিনি সমীচীন মনে করলেন না।

এদিকে নিজের ঘরে বসে ঈশা আবার সেই পুরনো বাড়ির ছবিটা দেখছিল। বিকেলে তোলা ছবিগুলো সে ইতিমধ্যে কয়েকবার ঘেঁটেছে, কিন্তু ওই একটা ছবির কাছেই বারবার ফিরে আসছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে জানালার অংশটুকু বড় করে রেখেছে। যতবার জুম করছে, ততবার মনে হচ্ছে ভেতরে কিছু একটা আছে। আবার পরের মুহূর্তেই মনে হচ্ছে সেটা হয়তো আলো-ছায়ার খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।

সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। নিজের ওপরই একটু বিরক্ত লাগছিল।

একটা ছবি নিয়ে এত ভাবার কী আছে?

অনন্যা থাকলে এতক্ষণে অন্তত পাঁচবার ভূতের তত্ত্ব দিয়ে ফেলত। সেই চিন্তায় ঈশার মুখে হালকা হাসি ফুটল। কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ টিকল না। কারণ অদ্ভুতভাবে তার মনে হচ্ছিল, ছবিটার মধ্যে এমন কিছু আছে যা সে এখনও ধরতে পারেনি।

অবশেষে ল্যাপটপটা বন্ধ করে সে উঠে দাঁড়াল।

— Enough. আজ আর না।

কথাটা নিজের উদ্দেশেই বলা।

দোতলার সামনের বারান্দায় বসে ছিলেন অরিন্দম। সন্ধ্যার আলো প্রায় মিলিয়ে গেছে। দূরের রাস্তার লাইটগুলো জ্বলে উঠেছে, আর ভেজা বাতাসে কোথাও থেকে রাতের ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। তাঁর সামনে রাখা চায়ের কাপটা প্রায় ঠান্ডা হয়ে গেছে। আজ অদ্ভুতভাবে মনটা স্থির হচ্ছে না।

গত কয়েক বছরে তিনি নিজের জীবনকে নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছেন। পরিবার, বাড়ি, নিত্যদিনের ছোটখাটো ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে অতীত যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। অন্তত তিনি তাই ভেবেছিলেন।

ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি পরিচিত নাম।

সমর।

অরিন্দম কল রিসিভ করলেন।

— বল।

ওপাশে সঙ্গে সঙ্গে পরিচিত হাসির শব্দ শোনা গেল।

— বাহ। এতদিন পরেও অভ্যর্থনা বদলায়নি।

— নাটক কম কর।

— চেষ্টা করি। পারি না।

অরিন্দমের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। সমর মুখার্জীর এই স্বভাবটা বহু বছরের পুরনো। পরিস্থিতি যতই গুরুতর হোক, কথার শুরুটা সে কখনও গম্ভীরভাবে করতে পারে না।

কিছুক্ষণ সাধারণ কথাবার্তা চলল। বাড়ির খবর, শরীরের খবর, পুরনো পরিচিতদের খবর। কিন্তু কথার ফাঁকেই অরিন্দম বুঝতে পারলেন, সমর আসলে অন্য কোনো কারণে ফোন করেছে। তার গলায় এমন একটা চাপা সতর্কতা ছিল, যেটা তিনি খুব ভালো করেই চেনেন।

একসময় সমর নিজেই প্রসঙ্গটা তুলল।

— আজ একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে।

— তারপর?

— একটা নাম শুনলাম।

অরিন্দম কিছু বললেন না। বারান্দার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। অনেক বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, কিছু কথা তাড়াহুড়ো করে বলা যায় না।

ওপাশে সমরও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

— নামটা প্রায় পাঁচ বছর শুনিনি।

এইবার অরিন্দমের আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে উঠল। বাতাস আগের মতোই বইছিল, কিন্তু তাঁর মনে হলো চারপাশের শব্দগুলো যেন দূরে সরে গেছে।

— নিশ্চিত?

— আমি নিশ্চিত না হলে ফোন করতাম না।

— উৎস?

— নির্ভরযোগ্য।

অরিন্দম ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন। একটা পুরনো স্মৃতি যেন মনের অন্ধকার কোণ থেকে উঠে এল। বহুদিন ধরে তিনি সেই স্মৃতিগুলোকে স্পর্শ করেননি।

— আর কিছু?

— আপাতত না। তবে নজর রাখছি।

— রাখো।

আবার কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর সমর নিচু গলায় বলল,

— যদি খবরটা সত্যি হয়, তাহলে...

বাকিটা শেষ করার প্রয়োজন ছিল না।

দুজনেই জানত, অসমাপ্ত বাক্যের শেষে কী শব্দ লুকিয়ে আছে।

কল কেটে যাওয়ার পরও অরিন্দম কিছুক্ষণ একইভাবে বসে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে স্টাডি রুমের দিকে গেলেন।

ঘরটার দরজা বন্ধ করে তিনি টেবিলের পাশে দাঁড়ালেন। কাঠের পুরনো ড্রয়ারটা খুলতেই পরিচিত কিছু জিনিস চোখে পড়ল—ফাইল, নোটবুক, কয়েকটি বিবর্ণ ফটোগ্রাফ। এক কোণে কালো কাপড়ে মোড়া একটি বস্তু রাখা।

অনেকদিন ধরে তিনি এটাকে স্পর্শ করেননি।

তবু প্রতিবার দেখলেই মনে হয়, সময়টা খুব বেশি দূরের নয়।

কাপড়টা সরানোর প্রয়োজন হলো না। ভেতরে কী আছে, তিনি খুব ভালো করেই জানেন।

কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তিনি ড্রয়ারটা আবার বন্ধ করে দিলেন। তারপর ঘরের আলো নিভিয়ে বেরিয়ে এলেন, যেন কোনো পুরনো স্মৃতিকে আবার অন্ধকারের মধ্যে রেখে এলেন।

রাত বাড়তে বাড়তে বাড়িটা শান্ত হয়ে গেল। ঋত্বিকের ঘর নিস্তব্ধ। ঈশার ঘরের আলোও নিভে গেছে। অমলেন্দু ও কুমুদিনী নিজেদের ঘরে। মেঘলা বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছেন।

শুধু অরিন্দমের ঘুম এল না।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। দূরে একটা কুকুর ডেকে উঠল, তারপর আবার সব শান্ত। তাঁর মাথার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই একটি কথাই।

পাঁচ বছর।

পাঁচ বছর ধরে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়টা শেষ হয়ে গেছে। অতীতের দরজা বন্ধ হয়েছে। আর ফিরে তাকানোর প্রয়োজন নেই।

কিন্তু সেদিন রাতে প্রথমবার তাঁর মনে হলো, কিছু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করা গেলেও ভেতর থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয় না।

হয়তো কিছু যুদ্ধ সত্যিই শেষ হয় না।

তারা শুধু অন্ধকারে অপেক্ষা করে।

No comments:

Post a Comment