ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ - ৫

অধ্যায় ১ : শান্তিকুঞ্জ

পর্ব ৫ : অচেনা গাড়ি


পরদিন সকালটা ছিল অদ্ভুতভাবে স্বচ্ছ। রাতের বৃষ্টির পরে আকাশের নীল রঙ যেন ধুয়ে-মুছে আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। বাড়ির সামনের আমগাছের পাতায় এখনও জলের ফোঁটা ঝুলছে, আর রোদ পড়লেই সেগুলো ছোট ছোট কাচের টুকরোর মতো ঝিকমিক করে উঠছে। সেনবাড়ির সকালের ছন্দও প্রতিদিনের মতোই শুরু হয়েছে। কুমুদিনী রান্নাঘরে মেঘলাকে সাহায্য করছেন, অমলেন্দু খবরের কাগজ হাতে বসে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যথারীতি উদ্বিগ্ন, আর ঋত্বিক স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন মুখ করে যেন তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।

ঈশা যখন নীচে নামল, তখন সকালের নাস্তা প্রায় শেষ। তার এলোমেলো চুল আর আধঘুমন্ত মুখ দেখে ঋত্বিক সুযোগ হাতছাড়া করল না।

— দিদি, তুমি officially lazy হয়ে যাচ্ছ।

ঈশা চেয়ারে বসতে বসতে এক টুকরো টোস্ট তুলে নিল।

— Lazy না। Creative।

— দুটোর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

— যেটা তুই বুঝবি না।

মেঘলা হেসে ফেললেন। অমলেন্দু কাগজ নামিয়ে বললেন,

— আমাদের সময়ে একে দেরি করে ওঠা বলা হতো।

— Language evolves, দাদু।

— আলস্যও evolve করেছে দেখছি।

টেবিল জুড়ে হাসির রোল উঠল। কথাগুলো তুচ্ছ, প্রতিদিনের মতোই সাধারণ। তবু এই ধরনের মুহূর্তই একটা পরিবারের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। মানুষ সাধারণত জীবনের বড় ঘটনাগুলো মনে রাখে, কিন্তু পরে ফিরে তাকালে দেখা যায়, আসল মূল্য ছিল এই ছোট ছোট নিরীহ কথোপকথনগুলোর মধ্যেই।

দুপুরের দিকে অরিন্দম বাড়ির সামনের বাগানে কাজ করছিলেন। কয়েকটা গোলাপগাছের ডাল ছাঁটা দরকার ছিল, আর নতুন লাগানো দুটো গাছের গোড়ায় মাটি আলগা করে দিতে হবে। এই কাজগুলো তিনি মন দিয়ে করেন। মাটি, গাছপালা আর নীরবতা—এই তিনটার মধ্যে এমন একটা শান্তি আছে, যা তিনি জীবনের অন্য কোথাও খুব একটা খুঁজে পান না। বারান্দা থেকে কুমুদিনী কয়েকবার বলে গেলেন রোদে বেশি না দাঁড়াতে, আর অরিন্দম প্রতিবারের মতোই "আর পাঁচ মিনিট" বলে কাজ চালিয়ে গেলেন।

ঠিক সেই সময় তাঁর চোখ রাস্তার ওপারে গিয়ে স্থির হলো।

একটা কালো SUV এসে ধীরে ধীরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রথমে তিনি বিষয়টাকে গুরুত্ব দেননি। এই এলাকায় মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন গাড়ি আসে, কেউ ঠিকানা খোঁজে, কেউ ফোনে কথা বলে, কেউ বা কারও জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু কয়েক মিনিট পরে তিনি লক্ষ্য করলেন, গাড়িটা এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ইঞ্জিন বন্ধ। কাচগুলো কালো। ভেতরে কে আছে বোঝার কোনো উপায় নেই।

অরিন্দমের ভেতরে বহু বছরের পুরনো একটা প্রবৃত্তি নিঃশব্দে মাথা তুলল। কোনো কিছু অস্বাভাবিক লাগলে সেটাকে অবহেলা না করে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তিনি আবার কাজে মন দিলেন বটে, কিন্তু নজরের একটা অংশ গাড়িটার ওপরই রয়ে গেল। প্রায় দশ মিনিট পর SUV-টা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল, তারপর মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল। গাড়িটা চলে যাওয়ার পরও তিনি কিছুক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। শেষ পর্যন্ত নিজের মনেই হালকা হাসলেন। হয়তো অযথাই সন্দেহ করছেন। সমরের ফোনের পর থেকে মাথাটা একটু বেশি সতর্ক হয়ে আছে।



বিকেলের দিকে ঈশা বেরিয়েছিল লেকের ধারে কিছু ছবি তুলতে। বর্ষার পরে লেকের চারপাশের আলো আর রঙ বদলে যায়, আর সেই সময়টা তার খুব প্রিয়। কয়েক ঘণ্টা ঘোরাঘুরির পর ফেরার পথে সে একটা ছোট ক্যাফেতে ঢুকল। জানালার ধারে বসে ঠান্ডা কফিতে চুমুক দিতে দিতে সে ক্যামেরার ছবিগুলো দেখছিল। ঠিক তখনই রাস্তার দিকে তাকিয়ে তার চোখে একটা কালো SUV পড়ল। গাড়িটা ধীরে ধীরে রাস্তা দিয়ে চলে গেল। ঈশা প্রথমে বিশেষ গুরুত্ব দিল না, কিন্তু পরের মুহূর্তেই মনে হলো কোথায় যেন এই গাড়িটাকে আগে দেখেছে। সে কয়েক সেকেন্ড ভাবল, তারপর কাঁধ ঝাঁকাল। হয়তো ভুল করছে। সারাদিনে এত গাড়ি দেখা যায় যে সব মনে রাখা সম্ভব নয়।

সন্ধ্যার একটু আগে সমরের ফোন এল। আগের দিনের মতোই তার গলায় সেই চাপা সতর্কতা ছিল, যদিও কথাবার্তা খুব সংক্ষিপ্ত।

— কোনো নতুন খবর?

অরিন্দম জিজ্ঞেস করলেন।

— বড় কিছু না। তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার জানলাম।

— কী?

— দু-একজন পুরনো লোককে কেউ খোঁজখবর নিচ্ছে।

— কারা?

— এখনও নিশ্চিত নই। তবে ভালো লাগছে না।

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। জানালার বাইরে সন্ধ্যার আলো ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছে।

— সাবধানে থাকো।

— তুমিও।

কলটা শেষ হয়ে গেল, কিন্তু কথাগুলো মাথা থেকে গেল না। অরিন্দম অজান্তেই দুপুরের SUV-টার কথা মনে করলেন। একা ঘটনাটা তুচ্ছ। কিন্তু কখনও কখনও তুচ্ছ ঘটনাগুলোই বড় ছবির অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

রাতের খাবারের পর সবাই যখন নিজেদের কাজে ব্যস্ত, তখন ঋত্বিক বারান্দায় এসে বাবার পাশে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপচাপ রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সে হঠাৎ বলল,

— বাবা, আজ একটা funny জিনিস দেখলাম।

— কী?

— দুপুরে একটা কালো SUV অনেকক্ষণ রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি ভাবলাম কারও বাড়ি খুঁজছে।

অরিন্দম ধীরে ধীরে ছেলের দিকে তাকালেন।

— কতক্ষণ ছিল?

— জানি না। আমি দু-তিনবার জানালা দিয়ে দেখেছি, তখনও ছিল।

— নম্বর দেখেছ?

— না। খেয়াল করিনি।

— হুম।

ঋত্বিক বিষয়টাকে আর গুরুত্ব দিল না। তার কাছে এটা দিনের অসংখ্য ছোট ঘটনার মধ্যে একটা মাত্র। সে কিছুক্ষণ পর ভেতরে চলে গেল। কিন্তু অরিন্দম বারান্দায় দাঁড়িয়েই রইলেন। দুপুরে তিনি নিজে গাড়িটা দেখেছেন। বিকেলে ঈশাও অজান্তে একই ধরনের গাড়ি দেখেছে। সন্ধ্যায় সমর পুরনো লোকদের খোঁজখবর নেওয়ার কথা বলেছে। আলাদা আলাদা করে দেখলে এগুলোর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।

তবু তাঁর অভিজ্ঞতা বলছে, বিপদ কখনও দরজায় কড়া নেড়ে নিজের পরিচয় দেয় না। প্রথমে সে আসে কাকতালীয় ঘটনার বেশ ধরে। তারপর একদিন হঠাৎ বুঝতে পারা যায়, সে অনেক আগেই এসে পৌঁছেছিল।

সেদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অরিন্দম একবার বাড়ির সামনের রাস্তার দিকে তাকালেন। রাস্তা ফাঁকা। সবকিছু স্বাভাবিক।

অন্তত আপাতদৃষ্টিতে।

ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ - ৪

 অধ্যায় ১ : শান্তিকুঞ্জ

পর্ব ৪ : সন্ধ্যার আলো

সন্ধ্যা নামার নিজস্ব একটা ছন্দ আছে। দিনের কোলাহল ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে, বাড়ির ভেতর আলো জ্বলে ওঠে, আর মানুষ অজান্তেই দিনের ব্যস্ততা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করে। সেনবাড়িতেও প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যা নেমেছে। নীচতলার পূজার ঘরে কুমুদিনী প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন। প্রদীপের ছোট্ট শিখা তাঁর মুখে এক ধরনের প্রশান্ত আভা এনে দিয়েছে। ধূপের গন্ধ বাড়ির ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে, আর সেই পরিচিত গন্ধের সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে বহু বছরের অভ্যাস, স্মৃতি আর নিরাপত্তার অনুভূতি।

ড্রয়িংরুমে অমলেন্দু সেন খবরের কাগজ খুলে বসে আছেন। খবর পড়ার চেয়ে খবরের সমালোচনা করতেই তিনি যেন বেশি আনন্দ পান। কিছুক্ষণ পরপর চশমা নাকের ডগায় নামিয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করছেন। দেশের অবস্থা কোথায় যাচ্ছে, বর্তমান প্রজন্ম কী ভুল করছে, আর সম্পাদকরা কেন ঠিকমতো লেখেন না—এই তিনটি বিষয় নিয়ে তিনি প্রায় প্রতিদিনই নতুন করে উদ্বিগ্ন হন।

দোতলায় নিজের ঘরে ঋত্বিক হেডফোন পরে কম্পিউটারের সামনে বসে আছে। ঘরের দরজা আধখোলা, আর সেখান থেকে মাঝে মাঝেই তার উত্তেজিত গলা ভেসে আসছে।

— আরে! Left side! Left side!

কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার প্রতিবাদ।

— না, এটা cheating!

নিচে বসে থাকা অমলেন্দু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— এরা যুদ্ধও করে, আবার নিজেরাই নিয়ম বানায়।

কুমুদিনী দূর থেকে উত্তর দিলেন,

— তোমাদের সময়েও কি আলাদা কিছু ছিল?

অমলেন্দু কাশির ভান করলেন। উত্তর দেওয়াটাকে তিনি সমীচীন মনে করলেন না।

এদিকে নিজের ঘরে বসে ঈশা আবার সেই পুরনো বাড়ির ছবিটা দেখছিল। বিকেলে তোলা ছবিগুলো সে ইতিমধ্যে কয়েকবার ঘেঁটেছে, কিন্তু ওই একটা ছবির কাছেই বারবার ফিরে আসছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে জানালার অংশটুকু বড় করে রেখেছে। যতবার জুম করছে, ততবার মনে হচ্ছে ভেতরে কিছু একটা আছে। আবার পরের মুহূর্তেই মনে হচ্ছে সেটা হয়তো আলো-ছায়ার খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।

সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। নিজের ওপরই একটু বিরক্ত লাগছিল।

একটা ছবি নিয়ে এত ভাবার কী আছে?

অনন্যা থাকলে এতক্ষণে অন্তত পাঁচবার ভূতের তত্ত্ব দিয়ে ফেলত। সেই চিন্তায় ঈশার মুখে হালকা হাসি ফুটল। কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ টিকল না। কারণ অদ্ভুতভাবে তার মনে হচ্ছিল, ছবিটার মধ্যে এমন কিছু আছে যা সে এখনও ধরতে পারেনি।

অবশেষে ল্যাপটপটা বন্ধ করে সে উঠে দাঁড়াল।

— Enough. আজ আর না।

কথাটা নিজের উদ্দেশেই বলা।

দোতলার সামনের বারান্দায় বসে ছিলেন অরিন্দম। সন্ধ্যার আলো প্রায় মিলিয়ে গেছে। দূরের রাস্তার লাইটগুলো জ্বলে উঠেছে, আর ভেজা বাতাসে কোথাও থেকে রাতের ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। তাঁর সামনে রাখা চায়ের কাপটা প্রায় ঠান্ডা হয়ে গেছে। আজ অদ্ভুতভাবে মনটা স্থির হচ্ছে না।

গত কয়েক বছরে তিনি নিজের জীবনকে নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছেন। পরিবার, বাড়ি, নিত্যদিনের ছোটখাটো ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে অতীত যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। অন্তত তিনি তাই ভেবেছিলেন।

ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি পরিচিত নাম।

সমর।

অরিন্দম কল রিসিভ করলেন।

— বল।

ওপাশে সঙ্গে সঙ্গে পরিচিত হাসির শব্দ শোনা গেল।

— বাহ। এতদিন পরেও অভ্যর্থনা বদলায়নি।

— নাটক কম কর।

— চেষ্টা করি। পারি না।

অরিন্দমের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। সমর মুখার্জীর এই স্বভাবটা বহু বছরের পুরনো। পরিস্থিতি যতই গুরুতর হোক, কথার শুরুটা সে কখনও গম্ভীরভাবে করতে পারে না।

কিছুক্ষণ সাধারণ কথাবার্তা চলল। বাড়ির খবর, শরীরের খবর, পুরনো পরিচিতদের খবর। কিন্তু কথার ফাঁকেই অরিন্দম বুঝতে পারলেন, সমর আসলে অন্য কোনো কারণে ফোন করেছে। তার গলায় এমন একটা চাপা সতর্কতা ছিল, যেটা তিনি খুব ভালো করেই চেনেন।

একসময় সমর নিজেই প্রসঙ্গটা তুলল।

— আজ একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে।

— তারপর?

— একটা নাম শুনলাম।

অরিন্দম কিছু বললেন না। বারান্দার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। অনেক বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, কিছু কথা তাড়াহুড়ো করে বলা যায় না।

ওপাশে সমরও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

— নামটা প্রায় পাঁচ বছর শুনিনি।

এইবার অরিন্দমের আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে উঠল। বাতাস আগের মতোই বইছিল, কিন্তু তাঁর মনে হলো চারপাশের শব্দগুলো যেন দূরে সরে গেছে।

— নিশ্চিত?

— আমি নিশ্চিত না হলে ফোন করতাম না।

— উৎস?

— নির্ভরযোগ্য।

অরিন্দম ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন। একটা পুরনো স্মৃতি যেন মনের অন্ধকার কোণ থেকে উঠে এল। বহুদিন ধরে তিনি সেই স্মৃতিগুলোকে স্পর্শ করেননি।

— আর কিছু?

— আপাতত না। তবে নজর রাখছি।

— রাখো।

আবার কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর সমর নিচু গলায় বলল,

— যদি খবরটা সত্যি হয়, তাহলে...

বাকিটা শেষ করার প্রয়োজন ছিল না।

দুজনেই জানত, অসমাপ্ত বাক্যের শেষে কী শব্দ লুকিয়ে আছে।

কল কেটে যাওয়ার পরও অরিন্দম কিছুক্ষণ একইভাবে বসে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে স্টাডি রুমের দিকে গেলেন।

ঘরটার দরজা বন্ধ করে তিনি টেবিলের পাশে দাঁড়ালেন। কাঠের পুরনো ড্রয়ারটা খুলতেই পরিচিত কিছু জিনিস চোখে পড়ল—ফাইল, নোটবুক, কয়েকটি বিবর্ণ ফটোগ্রাফ। এক কোণে কালো কাপড়ে মোড়া একটি বস্তু রাখা।

অনেকদিন ধরে তিনি এটাকে স্পর্শ করেননি।

তবু প্রতিবার দেখলেই মনে হয়, সময়টা খুব বেশি দূরের নয়।

কাপড়টা সরানোর প্রয়োজন হলো না। ভেতরে কী আছে, তিনি খুব ভালো করেই জানেন।

কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তিনি ড্রয়ারটা আবার বন্ধ করে দিলেন। তারপর ঘরের আলো নিভিয়ে বেরিয়ে এলেন, যেন কোনো পুরনো স্মৃতিকে আবার অন্ধকারের মধ্যে রেখে এলেন।

রাত বাড়তে বাড়তে বাড়িটা শান্ত হয়ে গেল। ঋত্বিকের ঘর নিস্তব্ধ। ঈশার ঘরের আলোও নিভে গেছে। অমলেন্দু ও কুমুদিনী নিজেদের ঘরে। মেঘলা বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছেন।

শুধু অরিন্দমের ঘুম এল না।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। দূরে একটা কুকুর ডেকে উঠল, তারপর আবার সব শান্ত। তাঁর মাথার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই একটি কথাই।

পাঁচ বছর।

পাঁচ বছর ধরে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়টা শেষ হয়ে গেছে। অতীতের দরজা বন্ধ হয়েছে। আর ফিরে তাকানোর প্রয়োজন নেই।

কিন্তু সেদিন রাতে প্রথমবার তাঁর মনে হলো, কিছু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করা গেলেও ভেতর থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয় না।

হয়তো কিছু যুদ্ধ সত্যিই শেষ হয় না।

তারা শুধু অন্ধকারে অপেক্ষা করে।

ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ - ৩

 অধ্যায় ১ : শান্তিকুঞ্জ

পর্ব ৩ : ঈশার পৃথিবী

দুপুরের রোদটা সেদিন অদ্ভুত ছিল।

সকালের মেঘ কেটে গেলেও আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। কোথাও কোথাও ধূসর মেঘের ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে, আবার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা সূর্যের আলো ভেজা পাতার ওপর পড়ে ঝিলমিল করছে। শহরের পুরনো কলেজ রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঈশা ক্যামেরাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে হাতে নিল।

তার অভ্যাস আছে।

অনেকেই দৃশ্য দেখে।

ঈশা ফ্রেম দেখে।

রাস্তার ধারে দাঁড়ানো চায়ের দোকানের বুড়ো লোকটা কাচের গ্লাস ধুচ্ছে। দূরে একটা রিকশা বৃষ্টির জলে তৈরি হওয়া ছোট্ট গর্ত এড়িয়ে যাচ্ছে। একটা কালো কুকুর রোদের টুকরোর মধ্যে গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে।

মানুষের কাছে এগুলো সাধারণ দৃশ্য।

ঈশার কাছে নয়।

সে হাঁটু গেড়ে বসে ক্যামেরা তুলল।

ক্লিক।

স্ক্রিনে ছবিটা ভেসে উঠতেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।

— Not bad.

পাশ থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল।

— তুই একদিন কুকুর-বিড়ালের official photographer হয়ে যাবি।

ঈশা মাথা তুলে তাকাল।

অনন্যা।

কলেজে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। মাঝারি উচ্চতা, কোঁকড়ানো চুল, মুখে সবসময় এমন অভিব্যক্তি যেন পৃথিবীর সব নাটক তার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে।

— এটা artistic photograph।

— হ্যাঁ, অবশ্যই। একটা ঘুমন্ত কুকুর। বিশ্বসংস্কৃতিতে বিরাট অবদান।

— তুই বুঝবি না।

— আমি চেষ্টা করছি না।

দুজনেই হেসে ফেলল।

কলেজ ছুটি হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। তবু তারা বাড়ি ফেরেনি। এই শহরের পুরনো অংশটায় ঘুরে বেড়াতে ঈশার ভালো লাগে।

এখানে সময় একটু ধীরে চলে।

পুরনো দোকান, পুরনো বাড়ি, পুরনো মানুষ।

আর পুরনো গল্প।

বিশেষ করে গল্প।

একটা সরু গলির মুখে পৌঁছে ঈশা থেমে গেল।

গলিটার শেষে একটা ভাঙাচোরা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। লোহার গেট মরচে পড়ে প্রায় লাল হয়ে গেছে। জানালার কাচের অর্ধেক ভাঙা।

অনন্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— আবার?

— কী আবার?

— তোর ওই haunted house obsession।

— Haunted না।

— অবশ্যই haunted।

— বৈজ্ঞানিকভাবে—

— চুপ।

ঈশা হাসল।

এই নিয়ে তাদের বহুদিনের তর্ক।

ঈশা রহস্য খোঁজে।

অনন্যা রহস্য এড়িয়ে চলে।

তবু শেষ পর্যন্ত রহস্যের পিছনে তাকেই টেনে নিয়ে যেতে হয়।

গলির দিকে তাকিয়ে ঈশা বলল,

— বাড়িটার একটা ছবি নেব।

— তারপর?

— তারপর কিছু না।

— তুই যখন বলিস "কিছু না", তখনই আমার সবচেয়ে ভয় করে।

ঈশা কোনো উত্তর দিল না।

ক্যামেরা তুলল।

ভিউফাইন্ডারের মধ্যে বাড়িটা আরও অন্যরকম দেখাচ্ছিল।

নিঃসঙ্গ।

নীরব।

অপেক্ষমাণ।

ক্লিক।

ছবি তোলার ঠিক পরেই তার চোখে একটা জিনিস ধরা পড়ল।

দ্বিতীয় তলার একটা জানালা।

মুহূর্তের জন্য মনে হলো সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।

খুব ক্ষণিকের জন্য।

তারপর নেই।

ঈশা ভুরু কুঁচকাল।

— কী হলো?

অনন্যা জিজ্ঞেস করল।

— কিছু না।

— নিশ্চিত?

— হয়তো চোখের ভুল।

তবু সে আরও একবার তাকাল।

জানালাটা এখন খালি।

হাওয়ায় ভাঙা পর্দার একটা অংশ নড়ছে।

আর কিছু না।

বিকেল চারটার দিকে ঈশা বাড়ি ফিরল।

ফটক খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেল কুমুদিনী বাগানে কাজ করছেন।

— এলি?

— হ্যাঁ ঠাম্মা।

— খেয়েছিস কিছু?

— না।

— বুঝেছি।

ঈশা হেসে ফেলল।

বাড়ির সবাই জানে, ক্যামেরা হাতে বেরোলে খাওয়ার কথা তার মাথা থেকে উধাও হয়ে যায়।

কুমুদিনী গাছের টব থেকে হাত সরিয়ে বললেন,

— তোর বাবা স্টাডি রুমে।

— কেন?

— জানি না। দুপুরে একজন এসেছিল।

ঈশা একটু অবাক হলো।

— কে?

— নাম শুনিনি।

— অফিসের কেউ?

— হতে পারে।

ঈশা মাথা নাড়ল।

বিশেষ গুরুত্ব দিল না।

কিন্তু কথাটা তার মাথায় থেকে গেল।

কারণ অরিন্দমের পুরনো সহকর্মীরা এখনও মাঝেমধ্যে আসে। তবে বেশিরভাগ সময়ই তারা সন্ধ্যার পর আসে।

দুপুরে খুব কম।

সে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।

স্টাডি রুমের দরজা বন্ধ।

ভেতর থেকে কোনো শব্দও আসছে না।

এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো দরজায় নক করতে।

কিন্তু করল না।

বাবার কিছু কিছু সময় থাকে, যখন তাকে একা থাকতে দেওয়াই ভালো।

এটা সে ছোটবেলা থেকেই শিখেছে।

সন্ধ্যার একটু আগে নিজের ঘরে বসে ছবিগুলো কম্পিউটারে ট্রান্সফার করছিল ঈশা।



একটার পর একটা ছবি স্ক্রিনে উঠছে।

কুকুর।

রিকশা।

চায়ের দোকান।

পুরনো বাড়ি।

হঠাৎ সে থেমে গেল।

ভাঙা বাড়িটার ছবিটা স্ক্রিনে বড় করে খুলল।

জুম করল।

আরও একটু।

আরও।

তারপর ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল।

দ্বিতীয় তলার জানালার ভেতরে কিছু একটা আছে।

মানুষ?

ছায়া?

নাকি আলো-ছায়ার খেলা?

নিশ্চিতভাবে বোঝা যাচ্ছে না।

তবু কিছু একটা আছে।

অনন্যাকে পাঠালে সে অবশ্য এক সেকেন্ডের মধ্যে ভূত ঘোষণা করে দেবে।

ঈশা মৃদু হাসল।

তারপর আবার ছবিটার দিকে তাকাল।

হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

কারণ এবার তার মনে হলো—

জানালার ভেতরের অস্পষ্ট অবয়বটা যেন সরাসরি ক্যামেরার দিকেই তাকিয়ে আছে।

ঠিক তার দিকে।

ঘরের বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। দূরে কোথাও প্রথম ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।

আর ঈশা বুঝতে পারল না, কেন ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার শরীরের ভেতর দিয়ে হালকা একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।

ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ - ২

অধ্যায় ১  : শান্তিকুঞ্জ 

পর্ব ২ : সকালের টেবিল

ডাইনিং রুমে ঢুকতেই অরিন্দম বুঝলেন, আন্তর্জাতিক সংকট কথাটা তিনি খুব একটা বাড়িয়ে বলেননি।

টেবিলের মাঝখানে দাবার বোর্ড। একদিকে অমলেন্দু সেন, অন্যদিকে ঋত্বিক। বোর্ডের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে খেলা নয়, সীমান্ত সংঘর্ষ চলছে। সাদা ঘুঁটিগুলো ছড়িয়ে আছে, কালো পক্ষের রানী অদ্ভুতভাবে বোর্ডের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে আছে, আর ঋত্বিকের মুখে এমন অভিব্যক্তি যেন তার সঙ্গে রাষ্ট্রদ্রোহ হয়েছে।

— বাবা, তুমি বলো, এটা legal?

অরিন্দম চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন,

— আগে অভিযোগটা শুনি।

— দাদু বলছে ওর রানী এখানে ছিল!

— ছিল।

— ছিল না!

— ছিল।

— ছিল না!

— ইতিহাস সাক্ষী, ছিল।

ঋত্বিক দুহাত তুলে আকাশের দিকে তাকাল।

— See? এটাই সমস্যা। দাদু নিজের ইতিহাস নিজেই লেখে।

অমলেন্দু চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন।

— বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে।

— দাদু, তুমি একটা local chess game জিতেছ। World War না।

— শুরুটা সবসময় ছোট হয়।

কুমুদিনী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,

— তোমরা সকালের নাস্তায় বসেছ, না জাতিসংঘের বৈঠকে?

তার হাতে গরম লুচির বাটি। বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই, তবু চলাফেরায় আশ্চর্য ফুর্তি। পরিবারের বাকিরা মাঝে মাঝে মজা করে বলে, বাড়ির প্রকৃত প্রধান কে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সবাই জানে, কুমুদিনী সেন চাইলে এই বাড়ির প্রত্যেককে পাঁচ মিনিটের মধ্যে চুপ করিয়ে দিতে পারেন।



— ঋত্বিক, আগে নাস্তা খা।

— দিদা, আমি একটা বড় অন্যায়ের বিচার চাইছি।

— খালি পেটে বিচার হয় না।

এই যুক্তির বিরুদ্ধে ঋত্বিকের কিছু বলার ছিল না।

অরিন্দম চুপচাপ দৃশ্যটা দেখছিলেন। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই এখন তাঁর দিনের সবচেয়ে প্রিয় অংশ। কেউ কাউকে গুরুত্ব দিয়ে ঝগড়া করছে না, তবু সবাই ঝগড়া করছে। কেউ কাউকে নিয়ে বিশেষ চিন্তিত বলে প্রকাশ করছে না, তবু প্রত্যেকেই অন্যের খেয়াল রাখছে।

পরিবারের ভালোবাসা অনেক সময় সরাসরি চোখে পড়ে না। তার অস্তিত্ব বোঝা যায় এইসব ছোটখাটো বিশৃঙ্খলায়।

ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে আসার শব্দ শোনা গেল।

একটু পরেই ঈশা ডাইনিং রুমে ঢুকল।

তার হাতে ফোন, কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগ, আর মুখে সেই চিরচেনা তাড়াহুড়ো।

— আমি late হয়ে গেছি!

— সুপ্রভাত।

মেঘলার গলায় মৃদু বিদ্রূপ।

— ও হ্যাঁ। Good morning সবাইকে।

— এবার মানুষের মতো বসে খাও।

ঈশা চেয়ারে বসে টেবিল থেকে একটা টোস্ট তুলে নিল।

— আমি খাচ্ছি তো।

— ওটাকে খাওয়া বলে না।

— মা, definition নিয়ে পরে আলোচনা করব?

অরিন্দম হেসে ফেললেন।

ঈশা সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।

— তুমি হাসছ কেন?

— কারণ তোমার মায়ের যুক্তি ঠিক।

— Great. তোমরাও একটা team।

— আমরা অনেক আগে থেকেই।

ঈশা নাটকীয়ভাবে মাথা নাড়ল।

— Unfair family.

ঋত্বিক সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— Welcome to the club.

দুই ভাইবোনের দিকে তাকিয়ে কুমুদিনী মুখ টিপে হাসলেন।

দুজনের স্বভাব সম্পূর্ণ আলাদা। ঈশা বাইরে থেকে অনেক বেশি শান্ত, কিন্তু তার কৌতূহল বিপজ্জনক পর্যায়ের। কোনো বিষয়ে আগ্রহ জন্মালে সেটা খুঁড়ে শেষ না করা পর্যন্ত সে ছাড়ে না। আর ঋত্বিক যেন একটানা চলতে থাকা রেডিও—সবসময় কিছু না কিছু বলবেই।

মেঘলা প্লেটে আরেকটা লুচি দিতে দিতে বললেন,

— আজ ক্লাস কতটা পর্যন্ত?

— দুটো।

— তারপর?

ঈশা একটু থামল।

এই থামাটা অরিন্দমের চোখ এড়াল না।

— তারপর... একটু ঘুরতে যাব।

— কোথায়?

— ওই পুরনো চা-বাগানের দিকে।

অমলেন্দু ভুরু তুললেন।

— ওখানে আবার কী আছে?

ঈশা কাঁধ ঝাঁকাল।

— ছবি।

— শুধু ছবি?

অরিন্দম জিজ্ঞেস করলেন।

— হয়তো।

— "হয়তো" মানে?

ঈশার চোখে দুষ্টু ঝিলিক দেখা গেল।

— একটু mystery।

ঋত্বিক সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহী হয়ে উঠল।

— Ghost hunt?

— না।

— Smuggling?

— না।

— Hidden treasure?

— Netflix কম দেখ।

— তুমি বলছ না কারণ কিছু একটা আছে।

ঈশা হেসে ফেলল।

— তুই বড় হয়ে detective হবি।

— AI engineer।

— তারপর detective AI বানাবি?

— That's actually a good idea.

অমলেন্দু গম্ভীর মুখে বললেন,

— তারপর সেই AI ইতিহাসও লিখবে।

— দাদু, আবার শুরু করো না।

ঘরে আবার হাসির রোল উঠল।

অরিন্দম চুপচাপ মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

ঈশার এই অভ্যাসটা নতুন নয়। ছোটবেলা থেকেই অদ্ভুত জায়গার প্রতি তার টান। পুরনো বাড়ি, ফাঁকা রেলস্টেশন, পরিত্যক্ত কারখানা, ভুলে যাওয়া মন্দির—সবকিছুর মধ্যেই সে গল্প খুঁজে পায়।

কখনও কখনও অরিন্দমের মনে হয়, এই স্বভাবটা হয়তো তার কাছ থেকেই এসেছে।

আবার সেই কারণেই তিনি চিন্তাও করেন।

কারণ পৃথিবীর সব গল্প সুখের হয় না।

ঈশা তখন ফোনে কিছু একটা দেখছিল। হঠাৎ মুখ তুলে বলল,

— বাবা।

— হুম?

— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

— কর।

— তুমি সত্যি সত্যি চাকরি ছেড়েছিলে কেন?

ঘরটা মুহূর্তের জন্য অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে গেল।

ঋত্বিকও মুখ তুলে তাকাল।

মেঘলা কিছু বললেন না।

অমলেন্দু চশমার কাচের উপর দিয়ে একবার ছেলের দিকে তাকালেন।

প্রশ্নটা নতুন নয়।

তবু প্রতি বারই যেন নতুন লাগে।

অরিন্দম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন,

— শান্তিতে থাকার জন্য।

ঈশা ভুরু কুঁচকাল।

— That's not the full answer.

— আমি তো বলিনি এটা full answer।

— তাহলে?

অরিন্দমের মুখে হালকা হাসি ফুটল।

— বাকিটা কোনোদিন বলব।

— Promise?

— দেখা যাবে।

— বাবা!

— নাস্তা শেষ কর।

ঈশা বিরক্ত মুখে মাথা নাড়ল।

কিন্তু জেদ করল না।

অরিন্দম জানতেন, সে বিষয়টা ভুলে যায়নি। শুধু আপাতত সরিয়ে রেখেছে।

আর কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো যতদিন উত্তর না পায়, ততদিনই বড় হতে থাকে।

বাইরে আবার হালকা বাতাস উঠেছে। আমগাছের ডাল নড়ে উঠল। জানলার কাচে রোদের একটা ফালি এসে পড়ল।

সকালের এই ছোট্ট দৃশ্যটার মধ্যে কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না।

তবু অরিন্দমের বুকের ভেতর দিয়ে এক ঝলক অস্বস্তি বয়ে গেল।

খুব ক্ষণিকের জন্য।

কারণ ছাড়া।

অথবা হয়তো কারণ ছিল, শুধু তিনি এখনও সেটা বুঝতে পারেননি।

ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ -১

 অধ্যায় ১ : শান্তিকুঞ্জ 

পর্ব ১ : বর্ষার সকাল

বর্ষার শেষের সকালগুলোর একটা আলাদা মেজাজ থাকে। সেগুলোকে পুরোপুরি আনন্দময়ও বলা যায় না, আবার বিষণ্ণও নয়। যেন দীর্ঘদিনের অতিথি বিদায় নেওয়ার আগে শেষবারের মতো চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। রাতের বৃষ্টির জল তখনও পাতার ডগায় ঝুলে থাকে, আর ভেজা মাটির গন্ধে বাতাসের মধ্যে একধরনের নরম ভার জমে ওঠে।

সেনবাড়ির সামনের উঠোনটাও সেদিন সেই গন্ধে ভরে ছিল। বাড়িটা এই শহরের পুরনো বাড়িগুলোর মতোই—দোতলা, প্রশস্ত, কোথাও কোথাও সময়ের ক্ষয়ে রং ফিকে হয়ে এসেছে, কিন্তু এখনও দৃঢ়। সামনের লোহার ফটক থেকে বাড়ি পর্যন্ত লাল কাঁকর বিছানো সরু পথ। পথের দুপাশে সারি সারি গাছ। জবা, টগর, গন্ধরাজ, বেলি। এক কোণে একটা পুরনো আমগাছ, যার পাতায় এখনও রাতের বৃষ্টির জল ঝুলে আছে। আর ঠিক বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা কৃষ্ণচূড়া। গ্রীষ্মে যে গাছটা আগুনের মতো লাল হয়ে ওঠে, বর্ষায় সে যেন শান্ত হয়ে গেছে।

গাছপালার বেশিরভাগই কুমুদিনী সেনের হাতে লাগানো। বাড়ির লোকেরা অনেকবার বলেছে, একজন মালী রাখা উচিত। কিন্তু তিনি রাজি হননি। "গাছের যত্ন টাকা দিয়ে হয় না, সময় দিয়ে হয়"—এই ছিল তাঁর যুক্তি। সত্তর পেরিয়েও প্রতিদিন সকালে তিনি গাছগুলোর কাছে সময় কাটান। কোনটার পাতায় পোকা ধরেছে, কোনটার মাটি আলগা করতে হবে, কোনটায় নতুন কুঁড়ি এসেছে—সব তাঁর নখদর্পণে।

সকাল সাতটার কিছু আগে অরিন্দম সেন দোতলার পূর্বমুখী বারান্দায় বসে ছিলেন। বারান্দাটা তাঁর খুব প্রিয়। এখান থেকে রাস্তার একটা অংশ দেখা যায়, দূরে একটা পুকুর, আর পরিষ্কার দিনে আরও দূরে রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ইউক্যালিপটাস গাছের সারিও। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, কোলে খোলা খবরের কাগজ। কিন্তু তিনি পড়ছিলেন না। পাতাগুলো বাতাসে নড়ছিল, অথচ তাঁর চোখ সেগুলোর উপর দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল।

পাঁচ বছর। সংখ্যাটা আজকাল প্রায়ই মাথায় আসে। পাঁচ বছর আগে তিনি চাকরি ছেড়েছিলেন। অনেকেই অবাক হয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিল, এমন সময়ে কেউ স্বেচ্ছায় সরে যায় না। আরও উপরে যাওয়ার সুযোগ ছিল, আরও ক্ষমতা, আরও প্রভাব, আরও সাফল্য। অরিন্দম কারও কথা শোনেননি। যারা খুব কাছের মানুষ, তারাও পুরো কারণ জানে না। এমনকি মেঘলাও না।

তিনি কাপ থেকে এক চুমুক চা খেলেন। চা একটু ঠান্ডা হয়ে এসেছে। সেটা টের পেয়েও কিছু মনে হলো না। নীচে রাস্তা দিয়ে একটা সাইকেলওয়ালা চলে গেল। তার ঘণ্টার শব্দ ভেজা সকালের নীরবতায় অদ্ভুত পরিষ্কার শোনাল। এই শহরটা অরিন্দমের ভালো লাগে। এখানে মানুষ এখনও একে অপরকে নাম ধরে চেনে। পাড়ার ওষুধের দোকানের মালিক জানে কার বাড়িতে কে অসুস্থ। মিষ্টির দোকানের লোক জানে কার ছেলে মাধ্যমিকে কত নম্বর পেয়েছে। সন্ধ্যার পর এখনও কিছু মানুষ চায়ের দোকানে বসে রাজনীতি নিয়ে তর্ক করে। বড় শহরের কাছে এগুলো তুচ্ছ মনে হতে পারে। অরিন্দমের কাছে নয়। কখনও কখনও খুব সাধারণ জিনিসও মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

ভেতর থেকে একটা শব্দ এল। তারপরই কুমুদিনী সেনের গলা শোনা গেল—

— মেঘলা! বলছি, ছেলেটা আবার দুধ না খেয়ে বসে আছে!

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটা কণ্ঠ ভেসে এল।

— আমি খেয়েছি!

— মিথ্যে কথা!

— মিথ্যে না!

— তাহলে গ্লাসে দুধ রইল কী করে?

— সেটা বৈজ্ঞানিক রহস্য।

অরিন্দমের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটল। ঋত্বিক। বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য, কিন্তু শব্দের দিক থেকে সম্ভবত সবচেয়ে বড়।

তারপর মেঘলার গলা শোনা গেল।

— ঋত্বিক, আবার কী করছ?

— কিছু না।

— এই "কিছু না" কথাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

— মা, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না।

— অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছি।

কথোপকথনটা শুনে অরিন্দম মাথা নাড়লেন। গত কয়েক বছরে তিনি একটা জিনিস বুঝেছেন—পরিবারের সবচেয়ে সাধারণ মুহূর্তগুলোই পরে স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। একসময় তাঁর সকাল শুরু হতো অন্যভাবে। রাত তিনটের ফোনকল, জরুরি বৈঠক, অভিযানের প্রস্তুতি। কখনও কখনও এমনও হয়েছে, বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন ভোরে, ফিরেছেন দুদিন পরে। ঈশার স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান মিস করেছেন। ঋত্বিকের জন্মদিন মিস করেছেন। বাবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর ফোনে শুনেছেন। তখন মনে হতো এটাই স্বাভাবিক। কর্তব্যের একটা দাম থাকে। আজ এত বছর পরে বসে মাঝে মাঝে ভাবেন—দামটা হয়তো একটু বেশিই ছিল।

বারান্দার কাচের দরজাটা সরিয়ে মেঘলা বাইরে এল। হাতে আরেক কাপ চা। ভেজা চুল পিঠে ছড়িয়ে আছে। শাড়িটা সাদামাটা, তবু তাকে দেখতে ভালো লাগছিল। পঁচিশ বছরের সংসারের পরেও কিছু কিছু দৃশ্য মানুষ নতুন করে লক্ষ্য করে।

মেঘলা তাঁর পাশের চেয়ারটায় বসল।

— চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

অরিন্দম কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন,

— হুম।

— তুমি আবার পড়ছও না।

— কে বলল?

— আমি পাঁচ মিনিট ধরে দেখছি। একই পাতায় আছ।

অরিন্দম এবার হেসে ফেললেন।

— গোয়েন্দাগিরি শুরু করেছ নাকি?

— তোমার সঙ্গে থাকতে থাকতে কিছু অভ্যাস হয়ে গেছে।

কথাটা শুনে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বারান্দার সামনে আমগাছ থেকে একটা ফোঁটা জল টুপ করে নীচে পড়ল। দূরে কোথাও একটা কোকিল ডাকল, যদিও এই ঋতুতে তার ডাকটা একটু বেমানানই শোনায়।

মেঘলা ধীর গলায় বলল,

— আবার পুরনো কথা ভাবছ?

অরিন্দম উত্তর দিতে একটু সময় নিলেন। প্রশ্নটা নতুন নয়। গত কয়েক বছরে মেঘলা বহুবার এই প্রশ্ন করেছে। কখনও সরাসরি, কখনও ঘুরিয়ে। আর তিনি প্রায় সবসময়ই উত্তর এড়িয়ে গেছেন।

— সবসময় না।

— কিন্তু মাঝে মাঝে?

তিনি সরাসরি উত্তর দিলেন না। কাপটা হাতে নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেঘলাও আর জোর করল না। এই বিষয়টা নিয়ে তারা বহু বছর ধরে এক অদ্ভুত সমঝোতায় পৌঁছেছে। কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর একদিন হয়তো পাওয়া যাবে। আবার হয়তো কখনও না।

ঠিক তখনই ভেতর থেকে এমন একটা আওয়াজ এল, যেন ভারী কিছু মেঝেতে পড়েছে। তার পরপরই ঋত্বিকের নাটকীয় চিৎকার শোনা গেল।

— দাদুউউ! এটা অন্যায়!

সঙ্গে সঙ্গে অমলেন্দু সেনের গম্ভীর গলা ভেসে এল।

— অন্যায় নয়। কৌশল।

মেঘলা চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল।

— শুরু হয়ে গেছে।

অরিন্দম উঠে দাঁড়ালেন।

— চলো দেখি, আজ কোন আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হয়েছে।

মেঘলাও হেসে ফেলল। দুজনেই ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। ডাইনিং রুম থেকে ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় দফার তর্কের শব্দ ভেসে আসছে। বাড়িটা যেন পুরোপুরি জেগে উঠেছে।

আর সেই মুহূর্তে, সেনবাড়ির কেউই জানত না যে তাদের জীবনের সবচেয়ে শান্ত সময়টা নিঃশব্দে শেষের দিকে এগিয়ে চলেছে। ঝড় এখনও অনেক দূরে। আকাশে তার কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু কিছু ঝড় আছে, যেগুলো প্রথমে মানুষের জীবনে নয়, ভাগ্যের অদৃশ্য প্রান্তে জন্ম নেয়।