ধারাবাহিক - ছায়ার ঋণ - ২

অধ্যায় ১  : শান্তিকুঞ্জ 
পর্ব ২ : সকালের টেবিল

ডাইনিং রুমে ঢুকতেই অরিন্দম বুঝলেন, আন্তর্জাতিক সংকট কথাটা তিনি খুব একটা বাড়িয়ে বলেননি।

টেবিলের মাঝখানে দাবার বোর্ড। একদিকে অমলেন্দু সেন, অন্যদিকে ঋত্বিক। বোর্ডের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে খেলা নয়, সীমান্ত সংঘর্ষ চলছে। সাদা ঘুঁটিগুলো ছড়িয়ে আছে, কালো পক্ষের রানী অদ্ভুতভাবে বোর্ডের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে আছে, আর ঋত্বিকের মুখে এমন অভিব্যক্তি যেন তার সঙ্গে রাষ্ট্রদ্রোহ হয়েছে।

— বাবা, তুমি বলো, এটা legal?

অরিন্দম চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন,

— আগে অভিযোগটা শুনি।

— দাদু বলছে ওর রানী এখানে ছিল!

— ছিল।

— ছিল না!

— ছিল।

— ছিল না!

— ইতিহাস সাক্ষী, ছিল।

ঋত্বিক দুহাত তুলে আকাশের দিকে তাকাল।

— See? এটাই সমস্যা। দাদু নিজের ইতিহাস নিজেই লেখে।

অমলেন্দু চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন।

— বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে।

— দাদু, তুমি একটা local chess game জিতেছ। World War না।

— শুরুটা সবসময় ছোট হয়।

কুমুদিনী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,

— তোমরা সকালের নাস্তায় বসেছ, না জাতিসংঘের বৈঠকে?

তার হাতে গরম লুচির বাটি। বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই, তবু চলাফেরায় আশ্চর্য ফুর্তি। পরিবারের বাকিরা মাঝে মাঝে মজা করে বলে, বাড়ির প্রকৃত প্রধান কে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সবাই জানে, কুমুদিনী সেন চাইলে এই বাড়ির প্রত্যেককে পাঁচ মিনিটের মধ্যে চুপ করিয়ে দিতে পারেন।

— ঋত্বিক, আগে নাস্তা খা।

— দিদা, আমি একটা বড় অন্যায়ের বিচার চাইছি।

— খালি পেটে বিচার হয় না।

এই যুক্তির বিরুদ্ধে ঋত্বিকের কিছু বলার ছিল না।

অরিন্দম চুপচাপ দৃশ্যটা দেখছিলেন। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই এখন তাঁর দিনের সবচেয়ে প্রিয় অংশ। কেউ কাউকে গুরুত্ব দিয়ে ঝগড়া করছে না, তবু সবাই ঝগড়া করছে। কেউ কাউকে নিয়ে বিশেষ চিন্তিত বলে প্রকাশ করছে না, তবু প্রত্যেকেই অন্যের খেয়াল রাখছে।

পরিবারের ভালোবাসা অনেক সময় সরাসরি চোখে পড়ে না। তার অস্তিত্ব বোঝা যায় এইসব ছোটখাটো বিশৃঙ্খলায়।

ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে আসার শব্দ শোনা গেল।

একটু পরেই ঈশা ডাইনিং রুমে ঢুকল।

তার হাতে ফোন, কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগ, আর মুখে সেই চিরচেনা তাড়াহুড়ো।

— আমি late হয়ে গেছি!

— সুপ্রভাত।

মেঘলার গলায় মৃদু বিদ্রূপ।

— ও হ্যাঁ। Good morning সবাইকে।

— এবার মানুষের মতো বসে খাও।

ঈশা চেয়ারে বসে টেবিল থেকে একটা টোস্ট তুলে নিল।

— আমি খাচ্ছি তো।

— ওটাকে খাওয়া বলে না।

— মা, definition নিয়ে পরে আলোচনা করব?

অরিন্দম হেসে ফেললেন।

ঈশা সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।

— তুমি হাসছ কেন?

— কারণ তোমার মায়ের যুক্তি ঠিক।

— Great. তোমরাও একটা team।

— আমরা অনেক আগে থেকেই।

ঈশা নাটকীয়ভাবে মাথা নাড়ল।

— Unfair family.

ঋত্বিক সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— Welcome to the club.

দুই ভাইবোনের দিকে তাকিয়ে কুমুদিনী মুখ টিপে হাসলেন।

দুজনের স্বভাব সম্পূর্ণ আলাদা। ঈশা বাইরে থেকে অনেক বেশি শান্ত, কিন্তু তার কৌতূহল বিপজ্জনক পর্যায়ের। কোনো বিষয়ে আগ্রহ জন্মালে সেটা খুঁড়ে শেষ না করা পর্যন্ত সে ছাড়ে না। আর ঋত্বিক যেন একটানা চলতে থাকা রেডিও—সবসময় কিছু না কিছু বলবেই।

মেঘলা প্লেটে আরেকটা লুচি দিতে দিতে বললেন,

— আজ ক্লাস কতটা পর্যন্ত?

— দুটো।

— তারপর?

ঈশা একটু থামল।

এই থামাটা অরিন্দমের চোখ এড়াল না।

— তারপর... একটু ঘুরতে যাব।

— কোথায়?

— ওই পুরনো চা-বাগানের দিকে।

অমলেন্দু ভুরু তুললেন।

— ওখানে আবার কী আছে?

ঈশা কাঁধ ঝাঁকাল।

— ছবি।

— শুধু ছবি?

অরিন্দম জিজ্ঞেস করলেন।

— হয়তো।

— "হয়তো" মানে?

ঈশার চোখে দুষ্টু ঝিলিক দেখা গেল।

— একটু mystery।

ঋত্বিক সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহী হয়ে উঠল।

— Ghost hunt?

— না।

— Smuggling?

— না।

— Hidden treasure?

— Netflix কম দেখ।

— তুমি বলছ না কারণ কিছু একটা আছে।

ঈশা হেসে ফেলল।

— তুই বড় হয়ে detective হবি।

— AI engineer।

— তারপর detective AI বানাবি?

— That's actually a good idea.

অমলেন্দু গম্ভীর মুখে বললেন,

— তারপর সেই AI ইতিহাসও লিখবে।

— দাদু, আবার শুরু করো না।

ঘরে আবার হাসির রোল উঠল।

অরিন্দম চুপচাপ মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

ঈশার এই অভ্যাসটা নতুন নয়। ছোটবেলা থেকেই অদ্ভুত জায়গার প্রতি তার টান। পুরনো বাড়ি, ফাঁকা রেলস্টেশন, পরিত্যক্ত কারখানা, ভুলে যাওয়া মন্দির—সবকিছুর মধ্যেই সে গল্প খুঁজে পায়।

কখনও কখনও অরিন্দমের মনে হয়, এই স্বভাবটা হয়তো তার কাছ থেকেই এসেছে।

আবার সেই কারণেই তিনি চিন্তাও করেন।

কারণ পৃথিবীর সব গল্প সুখের হয় না।

ঈশা তখন ফোনে কিছু একটা দেখছিল। হঠাৎ মুখ তুলে বলল,

— বাবা।

— হুম?

— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

— কর।

— তুমি সত্যি সত্যি চাকরি ছেড়েছিলে কেন?

ঘরটা মুহূর্তের জন্য অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে গেল।

ঋত্বিকও মুখ তুলে তাকাল।

মেঘলা কিছু বললেন না।

অমলেন্দু চশমার কাচের উপর দিয়ে একবার ছেলের দিকে তাকালেন।

প্রশ্নটা নতুন নয়।

তবু প্রতি বারই যেন নতুন লাগে।

অরিন্দম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন,

— শান্তিতে থাকার জন্য।

ঈশা ভুরু কুঁচকাল।

— That's not the full answer.

— আমি তো বলিনি এটা full answer।

— তাহলে?

অরিন্দমের মুখে হালকা হাসি ফুটল।

— বাকিটা কোনোদিন বলব।

— Promise?

— দেখা যাবে।

— বাবা!

— নাস্তা শেষ কর।

ঈশা বিরক্ত মুখে মাথা নাড়ল।

কিন্তু জেদ করল না।

অরিন্দম জানতেন, সে বিষয়টা ভুলে যায়নি। শুধু আপাতত সরিয়ে রেখেছে।

আর কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো যতদিন উত্তর না পায়, ততদিনই বড় হতে থাকে।

বাইরে আবার হালকা বাতাস উঠেছে। আমগাছের ডাল নড়ে উঠল। জানলার কাচে রোদের একটা ফালি এসে পড়ল।

সকালের এই ছোট্ট দৃশ্যটার মধ্যে কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না।

তবু অরিন্দমের বুকের ভেতর দিয়ে এক ঝলক অস্বস্তি বয়ে গেল।

খুব ক্ষণিকের জন্য।

কারণ ছাড়া।

অথবা হয়তো কারণ ছিল, শুধু তিনি এখনও সেটা বুঝতে পারেননি।

ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ -১

 অধ্যায় ১ : শান্তিকুঞ্জ 

পর্ব ১ : বর্ষার সকাল

বর্ষার শেষের সকালগুলোর একটা আলাদা মেজাজ থাকে। সেগুলোকে পুরোপুরি আনন্দময়ও বলা যায় না, আবার বিষণ্ণও নয়। যেন দীর্ঘদিনের অতিথি বিদায় নেওয়ার আগে শেষবারের মতো চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। রাতের বৃষ্টির জল তখনও পাতার ডগায় ঝুলে থাকে, আর ভেজা মাটির গন্ধে বাতাসের মধ্যে একধরনের নরম ভার জমে ওঠে।

সেনবাড়ির সামনের উঠোনটাও সেদিন সেই গন্ধে ভরে ছিল। বাড়িটা এই শহরের পুরনো বাড়িগুলোর মতোই—দোতলা, প্রশস্ত, কোথাও কোথাও সময়ের ক্ষয়ে রং ফিকে হয়ে এসেছে, কিন্তু এখনও দৃঢ়। সামনের লোহার ফটক থেকে বাড়ি পর্যন্ত লাল কাঁকর বিছানো সরু পথ। পথের দুপাশে সারি সারি গাছ। জবা, টগর, গন্ধরাজ, বেলি। এক কোণে একটা পুরনো আমগাছ, যার পাতায় এখনও রাতের বৃষ্টির জল ঝুলে আছে। আর ঠিক বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা কৃষ্ণচূড়া। গ্রীষ্মে যে গাছটা আগুনের মতো লাল হয়ে ওঠে, বর্ষায় সে যেন শান্ত হয়ে গেছে।

গাছপালার বেশিরভাগই কুমুদিনী সেনের হাতে লাগানো। বাড়ির লোকেরা অনেকবার বলেছে, একজন মালী রাখা উচিত। কিন্তু তিনি রাজি হননি। "গাছের যত্ন টাকা দিয়ে হয় না, সময় দিয়ে হয়"—এই ছিল তাঁর যুক্তি। সত্তর পেরিয়েও প্রতিদিন সকালে তিনি গাছগুলোর কাছে সময় কাটান। কোনটার পাতায় পোকা ধরেছে, কোনটার মাটি আলগা করতে হবে, কোনটায় নতুন কুঁড়ি এসেছে—সব তাঁর নখদর্পণে।

সকাল সাতটার কিছু আগে অরিন্দম সেন দোতলার পূর্বমুখী বারান্দায় বসে ছিলেন। বারান্দাটা তাঁর খুব প্রিয়। এখান থেকে রাস্তার একটা অংশ দেখা যায়, দূরে একটা পুকুর, আর পরিষ্কার দিনে আরও দূরে রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ইউক্যালিপটাস গাছের সারিও। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, কোলে খোলা খবরের কাগজ। কিন্তু তিনি পড়ছিলেন না। পাতাগুলো বাতাসে নড়ছিল, অথচ তাঁর চোখ সেগুলোর উপর দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল।

পাঁচ বছর। সংখ্যাটা আজকাল প্রায়ই মাথায় আসে। পাঁচ বছর আগে তিনি চাকরি ছেড়েছিলেন। অনেকেই অবাক হয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিল, এমন সময়ে কেউ স্বেচ্ছায় সরে যায় না। আরও উপরে যাওয়ার সুযোগ ছিল, আরও ক্ষমতা, আরও প্রভাব, আরও সাফল্য। অরিন্দম কারও কথা শোনেননি। যারা খুব কাছের মানুষ, তারাও পুরো কারণ জানে না। এমনকি মেঘলাও না।

তিনি কাপ থেকে এক চুমুক চা খেলেন। চা একটু ঠান্ডা হয়ে এসেছে। সেটা টের পেয়েও কিছু মনে হলো না। নীচে রাস্তা দিয়ে একটা সাইকেলওয়ালা চলে গেল। তার ঘণ্টার শব্দ ভেজা সকালের নীরবতায় অদ্ভুত পরিষ্কার শোনাল। এই শহরটা অরিন্দমের ভালো লাগে। এখানে মানুষ এখনও একে অপরকে নাম ধরে চেনে। পাড়ার ওষুধের দোকানের মালিক জানে কার বাড়িতে কে অসুস্থ। মিষ্টির দোকানের লোক জানে কার ছেলে মাধ্যমিকে কত নম্বর পেয়েছে। সন্ধ্যার পর এখনও কিছু মানুষ চায়ের দোকানে বসে রাজনীতি নিয়ে তর্ক করে। বড় শহরের কাছে এগুলো তুচ্ছ মনে হতে পারে। অরিন্দমের কাছে নয়। কখনও কখনও খুব সাধারণ জিনিসও মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

ভেতর থেকে একটা শব্দ এল। তারপরই কুমুদিনী সেনের গলা শোনা গেল—

— মেঘলা! বলছি, ছেলেটা আবার দুধ না খেয়ে বসে আছে!

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটা কণ্ঠ ভেসে এল।

— আমি খেয়েছি!

— মিথ্যে কথা!

— মিথ্যে না!

— তাহলে গ্লাসে দুধ রইল কী করে?

— সেটা বৈজ্ঞানিক রহস্য।

অরিন্দমের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটল। ঋত্বিক। বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য, কিন্তু শব্দের দিক থেকে সম্ভবত সবচেয়ে বড়।

তারপর মেঘলার গলা শোনা গেল।

— ঋত্বিক, আবার কী করছ?

— কিছু না।

— এই "কিছু না" কথাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

— মা, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না।

— অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছি।

কথোপকথনটা শুনে অরিন্দম মাথা নাড়লেন। গত কয়েক বছরে তিনি একটা জিনিস বুঝেছেন—পরিবারের সবচেয়ে সাধারণ মুহূর্তগুলোই পরে স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। একসময় তাঁর সকাল শুরু হতো অন্যভাবে। রাত তিনটের ফোনকল, জরুরি বৈঠক, অভিযানের প্রস্তুতি। কখনও কখনও এমনও হয়েছে, বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন ভোরে, ফিরেছেন দুদিন পরে। ঈশার স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান মিস করেছেন। ঋত্বিকের জন্মদিন মিস করেছেন। বাবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর ফোনে শুনেছেন। তখন মনে হতো এটাই স্বাভাবিক। কর্তব্যের একটা দাম থাকে। আজ এত বছর পরে বসে মাঝে মাঝে ভাবেন—দামটা হয়তো একটু বেশিই ছিল।

বারান্দার কাচের দরজাটা সরিয়ে মেঘলা বাইরে এল। হাতে আরেক কাপ চা। ভেজা চুল পিঠে ছড়িয়ে আছে। শাড়িটা সাদামাটা, তবু তাকে দেখতে ভালো লাগছিল। পঁচিশ বছরের সংসারের পরেও কিছু কিছু দৃশ্য মানুষ নতুন করে লক্ষ্য করে।

মেঘলা তাঁর পাশের চেয়ারটায় বসল।

— চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

অরিন্দম কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন,

— হুম।

— তুমি আবার পড়ছও না।

— কে বলল?

— আমি পাঁচ মিনিট ধরে দেখছি। একই পাতায় আছ।

অরিন্দম এবার হেসে ফেললেন।

— গোয়েন্দাগিরি শুরু করেছ নাকি?

— তোমার সঙ্গে থাকতে থাকতে কিছু অভ্যাস হয়ে গেছে।

কথাটা শুনে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বারান্দার সামনে আমগাছ থেকে একটা ফোঁটা জল টুপ করে নীচে পড়ল। দূরে কোথাও একটা কোকিল ডাকল, যদিও এই ঋতুতে তার ডাকটা একটু বেমানানই শোনায়।

মেঘলা ধীর গলায় বলল,

— আবার পুরনো কথা ভাবছ?

অরিন্দম উত্তর দিতে একটু সময় নিলেন। প্রশ্নটা নতুন নয়। গত কয়েক বছরে মেঘলা বহুবার এই প্রশ্ন করেছে। কখনও সরাসরি, কখনও ঘুরিয়ে। আর তিনি প্রায় সবসময়ই উত্তর এড়িয়ে গেছেন।

— সবসময় না।

— কিন্তু মাঝে মাঝে?

তিনি সরাসরি উত্তর দিলেন না। কাপটা হাতে নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেঘলাও আর জোর করল না। এই বিষয়টা নিয়ে তারা বহু বছর ধরে এক অদ্ভুত সমঝোতায় পৌঁছেছে। কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর একদিন হয়তো পাওয়া যাবে। আবার হয়তো কখনও না।

ঠিক তখনই ভেতর থেকে এমন একটা আওয়াজ এল, যেন ভারী কিছু মেঝেতে পড়েছে। তার পরপরই ঋত্বিকের নাটকীয় চিৎকার শোনা গেল।

— দাদুউউ! এটা অন্যায়!

সঙ্গে সঙ্গে অমলেন্দু সেনের গম্ভীর গলা ভেসে এল।

— অন্যায় নয়। কৌশল।

মেঘলা চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল।

— শুরু হয়ে গেছে।

অরিন্দম উঠে দাঁড়ালেন।

— চলো দেখি, আজ কোন আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হয়েছে।

মেঘলাও হেসে ফেলল। দুজনেই ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। ডাইনিং রুম থেকে ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় দফার তর্কের শব্দ ভেসে আসছে। বাড়িটা যেন পুরোপুরি জেগে উঠেছে।

আর সেই মুহূর্তে, সেনবাড়ির কেউই জানত না যে তাদের জীবনের সবচেয়ে শান্ত সময়টা নিঃশব্দে শেষের দিকে এগিয়ে চলেছে। ঝড় এখনও অনেক দূরে। আকাশে তার কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু কিছু ঝড় আছে, যেগুলো প্রথমে মানুষের জীবনে নয়, ভাগ্যের অদৃশ্য প্রান্তে জন্ম নেয়।

চাঁদের গল্প

 রোদের সকাল 

সকালের রোদ 

দেখে নাই কোনোদিন 

উঠে নাই ভোরবেলা 

ছোটবেলা কেটে গেছে আদুরে বিলাসিতায় 

মায়ের বুকের দুধে বাবার ছায়ায়।


স্কুল ছুটি হলে 

মিছে কথা বলে 

শ্যামলার ক্লাবঘরে 

জমিয়ে আড্ডা মেরে 

বাড়ি ফিরে সন্ধ্যায় আরো যেন মন চায় 

বাবার লাঠির ভয়ে পড়তে বসা।


কলেজে প্রথম বার 

মুখেতে চারমিনার 

মেঘ মেঘ চারিদিকে 

তারি ফাঁকে আসে চাঁদ 

চাঁদের ওই আসা দেখে বুকে যেন ঢেউ উঠে 

আশা জাগে চাঁদ যেন সাগরিকা হয়ে যায়।


কোনো এক বিকেলে 

আড্ডায় মেঘ ছিল, ছিল চায়ের জোয়ার 

চাঁদের গল্প ছিল, ঢেউদের হাহাকার 

হাঁসির ফোয়ারা ছিল সব মিলে একাকার 

তখন কে জানে 

এমন খবর এসে পড়বে কানে 

হারু নেই... 

দেহখানা আছে শুধু

ঢেউ থেমে গেছে তার 

তরঙ্গহীন এক সমুদ্র অপার।


রোদের সকাল 

সকালের রোদ 

রোদের সকাল 

সকালের রোদ

শঙ্খমালা - জীবনানন্দ দাশ


কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে
সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে,
বলিল, তােমারে চাই:
বেতের ফলের মতাে নীলাভ ব্যথিত তােমার দুই চোখ
খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি—কুয়াশার পাখনায়—
সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলােক
জোনাকির দেহ হতে—খুঁজেছি তােমারে সেইখানে—
ধূসর পেঁচার মতাে ডানা মেলে অঘ্রাণের অন্ধকারে
ধানসিড়ি বেয়ে বেয়ে
সােনার সিঁড়ির মতাে ধানে আর ধানে
তােমারে খুঁজেছি আমি নির্জন পেঁচার মতাে প্রাণে।

দেখিলাম দেহ তার বিমর্ষ পাখির রঙে ভরা;
সন্ধ্যার আঁধারে ভিজে শিরীষের ডালে যেই পাখি দেয় ধরা—
বাঁকা চাঁদ থাকে যার মাথার উপর,
শিঙের মতন বাঁকা নীল চাদ শােনে যার স্বর।

কড়ির মতাে শাদা মুখ তার,
দুইখানা হাত তার হিম;
চোখে তার হিজল কাঠের রক্তিম
চিতা জ্বলে: দখিন শিয়রে মাথা শঙ্খমালা যেন পুড়ে যায়
সে আগুনে হায়।

চোখে তার
যেন শত-শতাব্দীর নীল অন্ধকার!
স্তন তার
করুণ শঙ্খের মতাে—দুধে আর্দ্র—কবেকার শঙ্খিনীমালার!
এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।

কুড়ি বছর পরে - জীবনানন্দ দাশ


আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি।
আবার বছর কুড়ি পরে
হয়তাে ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে—তখন হলুদ নদী
নরম নরম হয় শর কাশ হােগলায়—মাঠের ভিতরে।
অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর;
ব্যস্ততা নাইকো আর,
হাঁসের নীড়ের থেকে খড়
পাখির নীড়ের থেকে খড়
ছড়াতেছে; মনিয়ার ঘরে রাত, শীত আর শিশিরের জল!
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার—
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তােমারে আবার!
হয়তাে এসেছে চাদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে
সরু সরু কালাে ডালপালা মুখে নিয়ে তার,
শিরীষের অথবা জামের,
ঝাউয়ের-আমের;
কুড়ি বছরের পরে তখন তােমারে নাই মনে!
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার-
তখন আবার যদি দেখা হয় তােমার আমার!


তখন হয়তাে মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা নামে—
বাবলার গলির অন্ধকারে
অশথের জানালার ফাকে
কোথায় লুকায় আপনাকে?
চোখের পাতার মতাে নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে—
সােনালি সােনালি চিল—শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে
কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তােমারে?

কার্তিকের ভােরে:১৩৪০ - জীবনানন্দ দাশ

কার্তিকের ভােরবেলা কবে
চোখে মুখে চুলের ওপরে
যে শিশির ঝরল তা
শালিক ঝরাল ব’লে ঝরে

আমলকী গাছ ছুঁয়ে তিনটি শালিক
কার্তিকের রােদে আর জলে
আমারই হৃদয় দিয়ে চেনা তিন নারীর মতন;
সূর্য? না কি সূর্যের চপ্পলে

পা গলিয়ে পৃথিবীতে এসে
পৃথিবীর থেকে উড়ে যায়
এ জীবনে ঢের শালিক দেখেছি
তবু সেই তিনজন শালিক কোথায়।

আমি যদি হতাম - জীবনানন্দ দাশ

আমি যদি হতাম বনহংস,
বনহংসী হতে যদি তুমি;
কোনাে এক দিগন্তের জলসিড়ি নদীর ধারে
ধানক্ষেতের কাছে
ছিপছিপে শরের ভিতর
এক নিরালা নীড়ে;

তাহলে আজ এই ফারুনের রাতে
ঝাউয়েরা শাখার পেছনে চাদ উঠতে দেখে
আমরা নিম্নভূমির জলের গন্ধ ছেড়ে
আকাশের রূপালী শস্যের ভিতর গা ভাসিয়ে দিতাম—

তােমার পাখনায় আমার পালক, আমার পাখনায় তােমার রক্তের স্পন্দন—
নীল আকাশে খই ক্ষেতের সােনালি ফুলের মতাে অজস্র তারা,
শিরীষ বনের সবুজ, রােমশ নীড়ে
সােনার ডিমের মতাে
ফাল্গুনের চাঁদ।
হয়তাে গুলির শব্দ:
আমাদের তির্যক গতিস্রোত,
আমাদের পাখায় পিস্টনের উল্লাস,
আমাদের কণ্ঠে উত্তর হাওয়ার গান।

হয়তাে গুলির শব্দ আবার;
আমাদের স্তব্ধতা,
আমাদের শান্তি।
আজকের জীবনের এই টুকরাে টুকরাে মৃত্যু আর থাকত না;

থাকত না আজকের জীবনের টুকরাে সাধের ব্যর্থতা ও অন্ধকার;
আমি যদি বনহংস হতাম;
বনহংসী হতে যদি তুমি;
কোনাে এক দিগন্তের জলসিড়ি নদীর ধারে
ধানক্ষেতের কাছে।

থাকত না আজকের জীবনের টুকরাে সাধের ব্যর্থতা ও অন্ধকার;
আমি যদি বনহংস হতাম;
বনহংসী হতে যদি তুমি;
কোনাে এক দিগন্তের জলসিড়ি নদীর ধারে
ধানক্ষেতের কাছে।

ধান কাটা হয়ে গেছে - জীবনানন্দ দাশ


ধান কাটা হ’য়ে গেছে কবে যেন—ক্ষেতে মাঠে পড়ে আছে খড়
পাতা কুটো ভাঙা ডিম—সাপের খােলস নীড় শীত।
এই সব উৎরায়ে ঐখানে মাঠের ভিতর।
ঘুমাতেছে কয়েকটি পরিচিত লোক আজ—কেমন নিবিড়।

ঐখানে একজন শুয়ে আছে—দিনরাত দেখা হ’তাে কত কত দিন,
হৃদয়ের খেলা নিয়ে তার কাছে করেছি যে কত অপরাধ;
শান্তি তবু: গভীর সবুজ ঘাস ঘাসের ফড়িং
আজ ঢেকে আছে তার চিন্তা আর জিজ্ঞাসার অন্ধকার স্বাদ।

বুনাে হাঁস - জীবনানন্দ দাশ


পেঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় নক্ষত্রের পানে
জলা মাঠ ছেড়ে দিয়ে চাদের আহ্বানে

বুনাে হাঁস পাখা মেলে—শাঁই শাঁই শব্দ শুনি তার;
এক- -দুই-তিন–চার—অজস্র—অপার—

রাত্রির কিনারা দিয়ে তাহাদের ক্ষিপ্র ডানা ঝাড়া
ইঞ্জিনের মতাে শব্দে; ছুটিতেছে—ছুটিতেছে তারা।

তারপর পড়ে থাকে নক্ষত্রের বিশাল আকাশ,
হাঁসের গায়ের ঘ্রাণ—দু একটা কল্পনার হাঁস;

মনে পড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালের মুখ;
উড়ুক উড়ুক তারা পউষের জ্যোৎস্নায় নীরবে উড়ুক

কল্পনার হাঁস সব— পৃথিবীর সব ধ্বনি সব রঙ মুছে গেলে পর
উড়ুক উড়ুক তারা হৃদয়ের শব্দহীন জ্যোৎস্নার ভিতর।

বনলতা সেন - জীবনানন্দ দাশ

হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।


চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

শিয়াল পণ্ডিত উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

 কুমির দেখলে, সে শিয়ালের সঙ্গে কিছুতেই পেরে উঠছে না। তখন সে ভাবলে, 'ও ঢের লেখাপড়া জানে, তাতেই খালি আমাকে ফাঁকি দেয়। আমি মূর্খ লোক, তাই তাকে আঁটতে পারি না।' অনেকক্ষণ ভেবে কুমির এই ঠিক করল যে, নিজের সাতটা ছেলেকে শিয়ালের কাছে দিয়ে খুব করে লেখাপড়া শেখাতে হবে। তার পরের দিনই সে ছানা সাতটাকে সঙ্গে করে শিয়ালের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হল। শিয়াল তখন তার গর্তের ভিতরে বসে কাঁকড়া খাচ্ছিল। কুমির এসে ডাকলে,


'শিয়াল পণ্ডিত, শিয়াল পণ্ডিত, বাড়ি আছ?' শিয়াল বাইরে এসে বললে, 'কী ভাই, কী মনে করে?'

কুমির বললে, 'ভাই, এই আমার ছেলে সাতটাকে তোমার কাছে এনেছি। মূর্খ হলে করে খেতে পারবে না। ভাই, তুমি যদি এদের একটু লেখাপড়া শিখিয়ে দাও।' শিয়াল বললে, 'সে আর বলতে? আমি সাতদিনে সাতজনকে পড়িয়ে পণ্ডিত করে দেব।' শুনে কুমির তো খুব খুশি হয়ে ছানা সাতটাকে রেখে চলে গেল।

তখন শিয়াল তাদের একটাকে আড়ালে নিয়ে বললে—

'পড় তো বাপু— কানা খানা গানা ঘানা,

কেমন লাগে কুমির ছানা?'