অধ্যায় ১ : শান্তিকুঞ্জ
পর্ব ৩ : ঈশার পৃথিবী
দুপুরের রোদটা সেদিন অদ্ভুত ছিল।
সকালের মেঘ কেটে গেলেও আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। কোথাও কোথাও ধূসর মেঘের ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে, আবার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা সূর্যের আলো ভেজা পাতার ওপর পড়ে ঝিলমিল করছে। শহরের পুরনো কলেজ রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঈশা ক্যামেরাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে হাতে নিল।
তার অভ্যাস আছে।
অনেকেই দৃশ্য দেখে।
ঈশা ফ্রেম দেখে।
রাস্তার ধারে দাঁড়ানো চায়ের দোকানের বুড়ো লোকটা কাচের গ্লাস ধুচ্ছে। দূরে একটা রিকশা বৃষ্টির জলে তৈরি হওয়া ছোট্ট গর্ত এড়িয়ে যাচ্ছে। একটা কালো কুকুর রোদের টুকরোর মধ্যে গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে।
মানুষের কাছে এগুলো সাধারণ দৃশ্য।
ঈশার কাছে নয়।
সে হাঁটু গেড়ে বসে ক্যামেরা তুলল।
ক্লিক।
স্ক্রিনে ছবিটা ভেসে উঠতেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।
— Not bad.
পাশ থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল।
— তুই একদিন কুকুর-বিড়ালের official photographer হয়ে যাবি।
ঈশা মাথা তুলে তাকাল।
অনন্যা।
কলেজে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। মাঝারি উচ্চতা, কোঁকড়ানো চুল, মুখে সবসময় এমন অভিব্যক্তি যেন পৃথিবীর সব নাটক তার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে।
— এটা artistic photograph।
— হ্যাঁ, অবশ্যই। একটা ঘুমন্ত কুকুর। বিশ্বসংস্কৃতিতে বিরাট অবদান।
— তুই বুঝবি না।
— আমি চেষ্টা করছি না।
দুজনেই হেসে ফেলল।
কলেজ ছুটি হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। তবু তারা বাড়ি ফেরেনি। এই শহরের পুরনো অংশটায় ঘুরে বেড়াতে ঈশার ভালো লাগে।
এখানে সময় একটু ধীরে চলে।
পুরনো দোকান, পুরনো বাড়ি, পুরনো মানুষ।
আর পুরনো গল্প।
বিশেষ করে গল্প।
একটা সরু গলির মুখে পৌঁছে ঈশা থেমে গেল।
গলিটার শেষে একটা ভাঙাচোরা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। লোহার গেট মরচে পড়ে প্রায় লাল হয়ে গেছে। জানালার কাচের অর্ধেক ভাঙা।
অনন্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আবার?
— কী আবার?
— তোর ওই haunted house obsession।
— Haunted না।
— অবশ্যই haunted।
— বৈজ্ঞানিকভাবে—
— চুপ।
ঈশা হাসল।
এই নিয়ে তাদের বহুদিনের তর্ক।
ঈশা রহস্য খোঁজে।
অনন্যা রহস্য এড়িয়ে চলে।
তবু শেষ পর্যন্ত রহস্যের পিছনে তাকেই টেনে নিয়ে যেতে হয়।
গলির দিকে তাকিয়ে ঈশা বলল,
— বাড়িটার একটা ছবি নেব।
— তারপর?
— তারপর কিছু না।
— তুই যখন বলিস "কিছু না", তখনই আমার সবচেয়ে ভয় করে।
ঈশা কোনো উত্তর দিল না।
ক্যামেরা তুলল।
ভিউফাইন্ডারের মধ্যে বাড়িটা আরও অন্যরকম দেখাচ্ছিল।
নিঃসঙ্গ।
নীরব।
অপেক্ষমাণ।
ক্লিক।
ছবি তোলার ঠিক পরেই তার চোখে একটা জিনিস ধরা পড়ল।
দ্বিতীয় তলার একটা জানালা।
মুহূর্তের জন্য মনে হলো সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।
খুব ক্ষণিকের জন্য।
তারপর নেই।
ঈশা ভুরু কুঁচকাল।
— কী হলো?
অনন্যা জিজ্ঞেস করল।
— কিছু না।
— নিশ্চিত?
— হয়তো চোখের ভুল।
তবু সে আরও একবার তাকাল।
জানালাটা এখন খালি।
হাওয়ায় ভাঙা পর্দার একটা অংশ নড়ছে।
আর কিছু না।
বিকেল চারটার দিকে ঈশা বাড়ি ফিরল।
ফটক খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেল কুমুদিনী বাগানে কাজ করছেন।
— এলি?
— হ্যাঁ ঠাম্মা।
— খেয়েছিস কিছু?
— না।
— বুঝেছি।
ঈশা হেসে ফেলল।
বাড়ির সবাই জানে, ক্যামেরা হাতে বেরোলে খাওয়ার কথা তার মাথা থেকে উধাও হয়ে যায়।
কুমুদিনী গাছের টব থেকে হাত সরিয়ে বললেন,
— তোর বাবা স্টাডি রুমে।
— কেন?
— জানি না। দুপুরে একজন এসেছিল।
ঈশা একটু অবাক হলো।
— কে?
— নাম শুনিনি।
— অফিসের কেউ?
— হতে পারে।
ঈশা মাথা নাড়ল।
বিশেষ গুরুত্ব দিল না।
কিন্তু কথাটা তার মাথায় থেকে গেল।
কারণ অরিন্দমের পুরনো সহকর্মীরা এখনও মাঝেমধ্যে আসে। তবে বেশিরভাগ সময়ই তারা সন্ধ্যার পর আসে।
দুপুরে খুব কম।
সে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
স্টাডি রুমের দরজা বন্ধ।
ভেতর থেকে কোনো শব্দও আসছে না।
এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো দরজায় নক করতে।
কিন্তু করল না।
বাবার কিছু কিছু সময় থাকে, যখন তাকে একা থাকতে দেওয়াই ভালো।
এটা সে ছোটবেলা থেকেই শিখেছে।
সন্ধ্যার একটু আগে নিজের ঘরে বসে ছবিগুলো কম্পিউটারে ট্রান্সফার করছিল ঈশা।
একটার পর একটা ছবি স্ক্রিনে উঠছে।
কুকুর।
রিকশা।
চায়ের দোকান।
পুরনো বাড়ি।
হঠাৎ সে থেমে গেল।
ভাঙা বাড়িটার ছবিটা স্ক্রিনে বড় করে খুলল।
জুম করল।
আরও একটু।
আরও।
তারপর ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল।
দ্বিতীয় তলার জানালার ভেতরে কিছু একটা আছে।
মানুষ?
ছায়া?
নাকি আলো-ছায়ার খেলা?
নিশ্চিতভাবে বোঝা যাচ্ছে না।
তবু কিছু একটা আছে।
অনন্যাকে পাঠালে সে অবশ্য এক সেকেন্ডের মধ্যে ভূত ঘোষণা করে দেবে।
ঈশা মৃদু হাসল।
তারপর আবার ছবিটার দিকে তাকাল।
হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কারণ এবার তার মনে হলো—
জানালার ভেতরের অস্পষ্ট অবয়বটা যেন সরাসরি ক্যামেরার দিকেই তাকিয়ে আছে।
ঠিক তার দিকে।
ঘরের বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। দূরে কোথাও প্রথম ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।
আর ঈশা বুঝতে পারল না, কেন ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার শরীরের ভেতর দিয়ে হালকা একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।





