ডাইনিং রুমে ঢুকতেই অরিন্দম বুঝলেন, আন্তর্জাতিক সংকট কথাটা তিনি খুব একটা বাড়িয়ে বলেননি।
টেবিলের মাঝখানে দাবার বোর্ড। একদিকে অমলেন্দু সেন, অন্যদিকে ঋত্বিক। বোর্ডের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে খেলা নয়, সীমান্ত সংঘর্ষ চলছে। সাদা ঘুঁটিগুলো ছড়িয়ে আছে, কালো পক্ষের রানী অদ্ভুতভাবে বোর্ডের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে আছে, আর ঋত্বিকের মুখে এমন অভিব্যক্তি যেন তার সঙ্গে রাষ্ট্রদ্রোহ হয়েছে।
— বাবা, তুমি বলো, এটা legal?
অরিন্দম চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন,
— আগে অভিযোগটা শুনি।
— দাদু বলছে ওর রানী এখানে ছিল!
— ছিল।
— ছিল না!
— ছিল।
— ছিল না!
— ইতিহাস সাক্ষী, ছিল।
ঋত্বিক দুহাত তুলে আকাশের দিকে তাকাল।
— See? এটাই সমস্যা। দাদু নিজের ইতিহাস নিজেই লেখে।
অমলেন্দু চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন।
— বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে।
— দাদু, তুমি একটা local chess game জিতেছ। World War না।
— শুরুটা সবসময় ছোট হয়।
কুমুদিনী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,
— তোমরা সকালের নাস্তায় বসেছ, না জাতিসংঘের বৈঠকে?
তার হাতে গরম লুচির বাটি। বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই, তবু চলাফেরায় আশ্চর্য ফুর্তি। পরিবারের বাকিরা মাঝে মাঝে মজা করে বলে, বাড়ির প্রকৃত প্রধান কে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সবাই জানে, কুমুদিনী সেন চাইলে এই বাড়ির প্রত্যেককে পাঁচ মিনিটের মধ্যে চুপ করিয়ে দিতে পারেন।
— ঋত্বিক, আগে নাস্তা খা।
— দিদা, আমি একটা বড় অন্যায়ের বিচার চাইছি।
— খালি পেটে বিচার হয় না।
এই যুক্তির বিরুদ্ধে ঋত্বিকের কিছু বলার ছিল না।
অরিন্দম চুপচাপ দৃশ্যটা দেখছিলেন। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই এখন তাঁর দিনের সবচেয়ে প্রিয় অংশ। কেউ কাউকে গুরুত্ব দিয়ে ঝগড়া করছে না, তবু সবাই ঝগড়া করছে। কেউ কাউকে নিয়ে বিশেষ চিন্তিত বলে প্রকাশ করছে না, তবু প্রত্যেকেই অন্যের খেয়াল রাখছে।
পরিবারের ভালোবাসা অনেক সময় সরাসরি চোখে পড়ে না। তার অস্তিত্ব বোঝা যায় এইসব ছোটখাটো বিশৃঙ্খলায়।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে আসার শব্দ শোনা গেল।
একটু পরেই ঈশা ডাইনিং রুমে ঢুকল।
তার হাতে ফোন, কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগ, আর মুখে সেই চিরচেনা তাড়াহুড়ো।
— আমি late হয়ে গেছি!
— সুপ্রভাত।
মেঘলার গলায় মৃদু বিদ্রূপ।
— ও হ্যাঁ। Good morning সবাইকে।
— এবার মানুষের মতো বসে খাও।
ঈশা চেয়ারে বসে টেবিল থেকে একটা টোস্ট তুলে নিল।
— আমি খাচ্ছি তো।
— ওটাকে খাওয়া বলে না।
— মা, definition নিয়ে পরে আলোচনা করব?
অরিন্দম হেসে ফেললেন।
ঈশা সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
— তুমি হাসছ কেন?
— কারণ তোমার মায়ের যুক্তি ঠিক।
— Great. তোমরাও একটা team।
— আমরা অনেক আগে থেকেই।
ঈশা নাটকীয়ভাবে মাথা নাড়ল।
— Unfair family.
ঋত্বিক সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— Welcome to the club.
দুই ভাইবোনের দিকে তাকিয়ে কুমুদিনী মুখ টিপে হাসলেন।
দুজনের স্বভাব সম্পূর্ণ আলাদা। ঈশা বাইরে থেকে অনেক বেশি শান্ত, কিন্তু তার কৌতূহল বিপজ্জনক পর্যায়ের। কোনো বিষয়ে আগ্রহ জন্মালে সেটা খুঁড়ে শেষ না করা পর্যন্ত সে ছাড়ে না। আর ঋত্বিক যেন একটানা চলতে থাকা রেডিও—সবসময় কিছু না কিছু বলবেই।
মেঘলা প্লেটে আরেকটা লুচি দিতে দিতে বললেন,
— আজ ক্লাস কতটা পর্যন্ত?
— দুটো।
— তারপর?
ঈশা একটু থামল।
এই থামাটা অরিন্দমের চোখ এড়াল না।
— তারপর... একটু ঘুরতে যাব।
— কোথায়?
— ওই পুরনো চা-বাগানের দিকে।
অমলেন্দু ভুরু তুললেন।
— ওখানে আবার কী আছে?
ঈশা কাঁধ ঝাঁকাল।
— ছবি।
— শুধু ছবি?
অরিন্দম জিজ্ঞেস করলেন।
— হয়তো।
— "হয়তো" মানে?
ঈশার চোখে দুষ্টু ঝিলিক দেখা গেল।
— একটু mystery।
ঋত্বিক সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহী হয়ে উঠল।
— Ghost hunt?
— না।
— Smuggling?
— না।
— Hidden treasure?
— Netflix কম দেখ।
— তুমি বলছ না কারণ কিছু একটা আছে।
ঈশা হেসে ফেলল।
— তুই বড় হয়ে detective হবি।
— AI engineer।
— তারপর detective AI বানাবি?
— That's actually a good idea.
অমলেন্দু গম্ভীর মুখে বললেন,
— তারপর সেই AI ইতিহাসও লিখবে।
— দাদু, আবার শুরু করো না।
ঘরে আবার হাসির রোল উঠল।
অরিন্দম চুপচাপ মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
ঈশার এই অভ্যাসটা নতুন নয়। ছোটবেলা থেকেই অদ্ভুত জায়গার প্রতি তার টান। পুরনো বাড়ি, ফাঁকা রেলস্টেশন, পরিত্যক্ত কারখানা, ভুলে যাওয়া মন্দির—সবকিছুর মধ্যেই সে গল্প খুঁজে পায়।
কখনও কখনও অরিন্দমের মনে হয়, এই স্বভাবটা হয়তো তার কাছ থেকেই এসেছে।
আবার সেই কারণেই তিনি চিন্তাও করেন।
কারণ পৃথিবীর সব গল্প সুখের হয় না।
ঈশা তখন ফোনে কিছু একটা দেখছিল। হঠাৎ মুখ তুলে বলল,
— বাবা।
— হুম?
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— কর।
— তুমি সত্যি সত্যি চাকরি ছেড়েছিলে কেন?
ঘরটা মুহূর্তের জন্য অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে গেল।
ঋত্বিকও মুখ তুলে তাকাল।
মেঘলা কিছু বললেন না।
অমলেন্দু চশমার কাচের উপর দিয়ে একবার ছেলের দিকে তাকালেন।
প্রশ্নটা নতুন নয়।
তবু প্রতি বারই যেন নতুন লাগে।
অরিন্দম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন,
— শান্তিতে থাকার জন্য।
ঈশা ভুরু কুঁচকাল।
— That's not the full answer.
— আমি তো বলিনি এটা full answer।
— তাহলে?
অরিন্দমের মুখে হালকা হাসি ফুটল।
— বাকিটা কোনোদিন বলব।
— Promise?
— দেখা যাবে।
— বাবা!
— নাস্তা শেষ কর।
ঈশা বিরক্ত মুখে মাথা নাড়ল।
কিন্তু জেদ করল না।
অরিন্দম জানতেন, সে বিষয়টা ভুলে যায়নি। শুধু আপাতত সরিয়ে রেখেছে।
আর কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো যতদিন উত্তর না পায়, ততদিনই বড় হতে থাকে।
বাইরে আবার হালকা বাতাস উঠেছে। আমগাছের ডাল নড়ে উঠল। জানলার কাচে রোদের একটা ফালি এসে পড়ল।
সকালের এই ছোট্ট দৃশ্যটার মধ্যে কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না।
তবু অরিন্দমের বুকের ভেতর দিয়ে এক ঝলক অস্বস্তি বয়ে গেল।
খুব ক্ষণিকের জন্য।
কারণ ছাড়া।
অথবা হয়তো কারণ ছিল, শুধু তিনি এখনও সেটা বুঝতে পারেননি।



