ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ - পর্ব ৭


অধ্যায় ২ : পুরনো ছায়া

পর্ব ২ : পুরনো মানচিত্র

সমর চলে যাওয়ার পর শান্তিকুঞ্জ আবার আগের মতোই শান্ত হয়ে গেল। বিকেলের রোদ ধীরে ধীরে নরম হচ্ছে। বারান্দায় কুমুদিনী তুলসীগাছে জল দিচ্ছেন, মেঘলা রান্নাঘরে রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আর অমলেন্দু পাশের বাড়ির রায়বাবুর সঙ্গে দাবার বোর্ড নিয়ে চিরন্তন তর্কে ব্যস্ত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এ বাড়িতে উদ্বেগ বলে কিছু নেই।

কিন্তু বাড়ির ভেতরে একজন মানুষ জানতেন, শান্তির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—ভাঙার আগে সেটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক বলে মনে হয়।

স্টাডি রুমে ঢুকে অরিন্দম দরজাটা আস্তে করে ভেজিয়ে দিলেন। টেবিলের ড্রয়ার খুলে সমর দিয়ে যাওয়া ভাঁজ করা কাগজটা আবার বের করলেন। একটিমাত্র শব্দ। আর সেই শব্দই যেন বহু বছর আগের অসংখ্য মুখ, অসংখ্য রাত আর অসংখ্য অসমাপ্ত অপারেশনকে একসঙ্গে ফিরিয়ে আনল।

তিনি ধীরে ধীরে পাশের আলমারির নিচের তাক থেকে একটা পুরনো টিনের বাক্স বের করলেন। বাক্সটার গায়ে ধুলো জমেছে, কিন্তু তালাটা চকচকে। বোঝাই যায়, মাঝে মাঝে সেটা খোলা হয়।

ভেতরে কয়েকটা ফাইল, একটা পুরনো কম্পাস, কিছু ভাঁজ করা মানচিত্র, আর নীল কাপড়ে মোড়া একটা ছোট ডায়েরি।

অরিন্দম ডায়েরিটা নয়, মানচিত্রগুলোর একটা খুললেন।

উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত অঞ্চল। লাল, নীল আর কালো কালিতে হাতে আঁকা অসংখ্য দাগ, বৃত্ত, তীরচিহ্ন। সরকারি মানচিত্র নয়, মাঠে নেমে তৈরি করা অপারেশন ম্যাপ। কোথাও নদীপথ, কোথাও জঙ্গল, কোথাও অচেনা গ্রামের নাম।

একসময় এই কাগজগুলোই ছিল তাঁর পৃথিবী।

হঠাৎ দরজায় হালকা টোকা পড়ল।

তিনি দ্রুত মানচিত্রটা ভাঁজ করে ফেললেন।

— বাবা... ঢুকব?

ঈশার গলা।

— আয়।

ঈশা ভেতরে ঢুকে চারদিকে তাকাল। তার চোখে কৌতূহল বরাবরই একটু বেশি।

— Disturb করছি?

— না। বল।

— আমার camera bag-টা দেখেছ? কাল এখানেই রেখেছিলাম।

অরিন্দম হেসে আলমারির পাশের চেয়ারটার দিকে দেখালেন।

— ওখানে।

ব্যাগটা তুলে নিতে নিতে ঈশার চোখ এক মুহূর্তের জন্য টেবিলের ওপর রাখা ভাঁজ করা মানচিত্রে গিয়ে থামল।

— Hiking plan নাকি?

অরিন্দম এক সেকেন্ডের জন্য মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,

— অনেক পুরনো অফিসের কাগজ। ফেলে দেওয়ার কথা ভাবছি।

ঈশা মাথা নাড়ল।

— ফেলো না। পুরনো জিনিসের আলাদা charm আছে।

হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।

দরজাটা বন্ধ হওয়ার পর অরিন্দম অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন। ছোট্ট একটা প্রশ্ন। খুব সাধারণ একটা কৌতূহল। তবু আজ তাঁর মনে হলো, পরিবারের কাছ থেকে তিনি কত বিশাল একটা সত্য লুকিয়ে রেখেছেন।


অন্যদিকে ঈশা নিজের ঘরে ফিরে ক্যামেরার মেমোরি কার্ড কম্পিউটারে ঢুকাল। গত কয়েক দিনের তোলা ছবিগুলো সাজাতে সাজাতে আবার সেই পুরনো বাড়িটার ছবির সামনে এসে থামল।

আজ নতুন চোখে ছবিটা দেখল সে।

ছায়াটার দিকে নয়।

বাড়িটার দিকে।

জানালার কাঠ, ভাঙা বারান্দা, দেয়ালের ফাটল—সবকিছু খুব মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে করতে তার হঠাৎ মনে হলো, বাড়িটার কোথাও একটা অদ্ভুত পরিচিতি আছে।

সে নিজের মনেই বিড়বিড় করল,

— কোথায় দেখেছি এটা?

উত্তর এল না।


রাত ন'টার কিছু পরে অরিন্দমের ফোনে একটি ছোট্ট বার্তা এল।

"আগামীকাল সন্ধ্যা। পুরনো জায়গা। একাই এসো। — S"

তিনি বার্তাটা পড়ে সঙ্গে সঙ্গে মুছে দিলেন।

জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন, বাগানের ওপর চাঁদের আলো পড়েছে। রঙ্গনের লাল ফুলগুলো এখন প্রায় কালো দেখাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর মেঘলা ঘরে ঢুকলেন।

— কী ভাবছ?

অরিন্দম হাসলেন।

— কিছু না।

মেঘলা তাঁর মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন।

— তোমাকে আমি অনেক বছর ধরে চিনি।

— জানি।

— আর সেই কারণেই বুঝতে পারছি, তুমি কিছু একটা লুকোচ্ছ।

ঘরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল।

অরিন্দম এগিয়ে এসে মেঘলার হাতটা আলতো করে ধরলেন।

— সময় হলে সব বলব।

মেঘলা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। শুধু মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

অরিন্দম জানতেন, কথাটা তিনি সত্যিই বলতে চেয়েছেন।

শুধু সেই সময়টা এখনও আসেনি।

(অধ্যায় ২ | পর্ব ২ সমাপ্ত)

No comments:

Post a Comment