অধ্যায় ১ : শান্তিকুঞ্জ
পর্ব ১ : বর্ষার সকাল
বর্ষার শেষের সকালগুলোর একটা আলাদা মেজাজ থাকে। সেগুলোকে পুরোপুরি আনন্দময়ও বলা যায় না, আবার বিষণ্ণও নয়। যেন দীর্ঘদিনের অতিথি বিদায় নেওয়ার আগে শেষবারের মতো চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। রাতের বৃষ্টির জল তখনও পাতার ডগায় ঝুলে থাকে, আর ভেজা মাটির গন্ধে বাতাসের মধ্যে একধরনের নরম ভার জমে ওঠে।
সেনবাড়ির সামনের উঠোনটাও সেদিন সেই গন্ধে ভরে ছিল। বাড়িটা এই শহরের পুরনো বাড়িগুলোর মতোই—দোতলা, প্রশস্ত, কোথাও কোথাও সময়ের ক্ষয়ে রং ফিকে হয়ে এসেছে, কিন্তু এখনও দৃঢ়। সামনের লোহার ফটক থেকে বাড়ি পর্যন্ত লাল কাঁকর বিছানো সরু পথ। পথের দুপাশে সারি সারি গাছ। জবা, টগর, গন্ধরাজ, বেলি। এক কোণে একটা পুরনো আমগাছ, যার পাতায় এখনও রাতের বৃষ্টির জল ঝুলে আছে। আর ঠিক বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা কৃষ্ণচূড়া। গ্রীষ্মে যে গাছটা আগুনের মতো লাল হয়ে ওঠে, বর্ষায় সে যেন শান্ত হয়ে গেছে।
গাছপালার বেশিরভাগই কুমুদিনী সেনের হাতে লাগানো। বাড়ির লোকেরা অনেকবার বলেছে, একজন মালী রাখা উচিত। কিন্তু তিনি রাজি হননি। "গাছের যত্ন টাকা দিয়ে হয় না, সময় দিয়ে হয়"—এই ছিল তাঁর যুক্তি। সত্তর পেরিয়েও প্রতিদিন সকালে তিনি গাছগুলোর কাছে সময় কাটান। কোনটার পাতায় পোকা ধরেছে, কোনটার মাটি আলগা করতে হবে, কোনটায় নতুন কুঁড়ি এসেছে—সব তাঁর নখদর্পণে।
সকাল সাতটার কিছু আগে অরিন্দম সেন দোতলার পূর্বমুখী বারান্দায় বসে ছিলেন। বারান্দাটা তাঁর খুব প্রিয়। এখান থেকে রাস্তার একটা অংশ দেখা যায়, দূরে একটা পুকুর, আর পরিষ্কার দিনে আরও দূরে রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ইউক্যালিপটাস গাছের সারিও। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, কোলে খোলা খবরের কাগজ। কিন্তু তিনি পড়ছিলেন না। পাতাগুলো বাতাসে নড়ছিল, অথচ তাঁর চোখ সেগুলোর উপর দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল।
পাঁচ বছর। সংখ্যাটা আজকাল প্রায়ই মাথায় আসে। পাঁচ বছর আগে তিনি চাকরি ছেড়েছিলেন। অনেকেই অবাক হয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিল, এমন সময়ে কেউ স্বেচ্ছায় সরে যায় না। আরও উপরে যাওয়ার সুযোগ ছিল, আরও ক্ষমতা, আরও প্রভাব, আরও সাফল্য। অরিন্দম কারও কথা শোনেননি। যারা খুব কাছের মানুষ, তারাও পুরো কারণ জানে না। এমনকি মেঘলাও না।
তিনি কাপ থেকে এক চুমুক চা খেলেন। চা একটু ঠান্ডা হয়ে এসেছে। সেটা টের পেয়েও কিছু মনে হলো না। নীচে রাস্তা দিয়ে একটা সাইকেলওয়ালা চলে গেল। তার ঘণ্টার শব্দ ভেজা সকালের নীরবতায় অদ্ভুত পরিষ্কার শোনাল। এই শহরটা অরিন্দমের ভালো লাগে। এখানে মানুষ এখনও একে অপরকে নাম ধরে চেনে। পাড়ার ওষুধের দোকানের মালিক জানে কার বাড়িতে কে অসুস্থ। মিষ্টির দোকানের লোক জানে কার ছেলে মাধ্যমিকে কত নম্বর পেয়েছে। সন্ধ্যার পর এখনও কিছু মানুষ চায়ের দোকানে বসে রাজনীতি নিয়ে তর্ক করে। বড় শহরের কাছে এগুলো তুচ্ছ মনে হতে পারে। অরিন্দমের কাছে নয়। কখনও কখনও খুব সাধারণ জিনিসও মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
ভেতর থেকে একটা শব্দ এল। তারপরই কুমুদিনী সেনের গলা শোনা গেল—
— মেঘলা! বলছি, ছেলেটা আবার দুধ না খেয়ে বসে আছে!
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটা কণ্ঠ ভেসে এল।
— আমি খেয়েছি!
— মিথ্যে কথা!
— মিথ্যে না!
— তাহলে গ্লাসে দুধ রইল কী করে?
— সেটা বৈজ্ঞানিক রহস্য।
অরিন্দমের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটল। ঋত্বিক। বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য, কিন্তু শব্দের দিক থেকে সম্ভবত সবচেয়ে বড়।
তারপর মেঘলার গলা শোনা গেল।
— ঋত্বিক, আবার কী করছ?
— কিছু না।
— এই "কিছু না" কথাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
— মা, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না।
— অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছি।
কথোপকথনটা শুনে অরিন্দম মাথা নাড়লেন। গত কয়েক বছরে তিনি একটা জিনিস বুঝেছেন—পরিবারের সবচেয়ে সাধারণ মুহূর্তগুলোই পরে স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। একসময় তাঁর সকাল শুরু হতো অন্যভাবে। রাত তিনটের ফোনকল, জরুরি বৈঠক, অভিযানের প্রস্তুতি। কখনও কখনও এমনও হয়েছে, বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন ভোরে, ফিরেছেন দুদিন পরে। ঈশার স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান মিস করেছেন। ঋত্বিকের জন্মদিন মিস করেছেন। বাবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর ফোনে শুনেছেন। তখন মনে হতো এটাই স্বাভাবিক। কর্তব্যের একটা দাম থাকে। আজ এত বছর পরে বসে মাঝে মাঝে ভাবেন—দামটা হয়তো একটু বেশিই ছিল।
বারান্দার কাচের দরজাটা সরিয়ে মেঘলা বাইরে এল। হাতে আরেক কাপ চা। ভেজা চুল পিঠে ছড়িয়ে আছে। শাড়িটা সাদামাটা, তবু তাকে দেখতে ভালো লাগছিল। পঁচিশ বছরের সংসারের পরেও কিছু কিছু দৃশ্য মানুষ নতুন করে লক্ষ্য করে।
মেঘলা তাঁর পাশের চেয়ারটায় বসল।
— চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
অরিন্দম কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন,
— হুম।
— তুমি আবার পড়ছও না।
— কে বলল?
— আমি পাঁচ মিনিট ধরে দেখছি। একই পাতায় আছ।
অরিন্দম এবার হেসে ফেললেন।
— গোয়েন্দাগিরি শুরু করেছ নাকি?
— তোমার সঙ্গে থাকতে থাকতে কিছু অভ্যাস হয়ে গেছে।
কথাটা শুনে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বারান্দার সামনে আমগাছ থেকে একটা ফোঁটা জল টুপ করে নীচে পড়ল। দূরে কোথাও একটা কোকিল ডাকল, যদিও এই ঋতুতে তার ডাকটা একটু বেমানানই শোনায়।
মেঘলা ধীর গলায় বলল,
— আবার পুরনো কথা ভাবছ?
অরিন্দম উত্তর দিতে একটু সময় নিলেন। প্রশ্নটা নতুন নয়। গত কয়েক বছরে মেঘলা বহুবার এই প্রশ্ন করেছে। কখনও সরাসরি, কখনও ঘুরিয়ে। আর তিনি প্রায় সবসময়ই উত্তর এড়িয়ে গেছেন।
— সবসময় না।
— কিন্তু মাঝে মাঝে?
তিনি সরাসরি উত্তর দিলেন না। কাপটা হাতে নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেঘলাও আর জোর করল না। এই বিষয়টা নিয়ে তারা বহু বছর ধরে এক অদ্ভুত সমঝোতায় পৌঁছেছে। কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর একদিন হয়তো পাওয়া যাবে। আবার হয়তো কখনও না।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে এমন একটা আওয়াজ এল, যেন ভারী কিছু মেঝেতে পড়েছে। তার পরপরই ঋত্বিকের নাটকীয় চিৎকার শোনা গেল।
— দাদুউউ! এটা অন্যায়!
সঙ্গে সঙ্গে অমলেন্দু সেনের গম্ভীর গলা ভেসে এল।
— অন্যায় নয়। কৌশল।
মেঘলা চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল।
— শুরু হয়ে গেছে।
অরিন্দম উঠে দাঁড়ালেন।
— চলো দেখি, আজ কোন আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হয়েছে।
মেঘলাও হেসে ফেলল। দুজনেই ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। ডাইনিং রুম থেকে ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় দফার তর্কের শব্দ ভেসে আসছে। বাড়িটা যেন পুরোপুরি জেগে উঠেছে।
আর সেই মুহূর্তে, সেনবাড়ির কেউই জানত না যে তাদের জীবনের সবচেয়ে শান্ত সময়টা নিঃশব্দে শেষের দিকে এগিয়ে চলেছে। ঝড় এখনও অনেক দূরে। আকাশে তার কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু কিছু ঝড় আছে, যেগুলো প্রথমে মানুষের জীবনে নয়, ভাগ্যের অদৃশ্য প্রান্তে জন্ম নেয়।
No comments:
Post a Comment