ধারাবাহিক উপন্যাস - ছায়ার ঋণ - ৫

অধ্যায় ১ : শান্তিকুঞ্জ

পর্ব ৫ : অচেনা গাড়ি


পরদিন সকালটা ছিল অদ্ভুতভাবে স্বচ্ছ। রাতের বৃষ্টির পরে আকাশের নীল রঙ যেন ধুয়ে-মুছে আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। বাড়ির সামনের আমগাছের পাতায় এখনও জলের ফোঁটা ঝুলছে, আর রোদ পড়লেই সেগুলো ছোট ছোট কাচের টুকরোর মতো ঝিকমিক করে উঠছে। সেনবাড়ির সকালের ছন্দও প্রতিদিনের মতোই শুরু হয়েছে। কুমুদিনী রান্নাঘরে মেঘলাকে সাহায্য করছেন, অমলেন্দু খবরের কাগজ হাতে বসে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যথারীতি উদ্বিগ্ন, আর ঋত্বিক স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন মুখ করে যেন তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।

ঈশা যখন নীচে নামল, তখন সকালের নাস্তা প্রায় শেষ। তার এলোমেলো চুল আর আধঘুমন্ত মুখ দেখে ঋত্বিক সুযোগ হাতছাড়া করল না।

— দিদি, তুমি officially lazy হয়ে যাচ্ছ।

ঈশা চেয়ারে বসতে বসতে এক টুকরো টোস্ট তুলে নিল।

— Lazy না। Creative।

— দুটোর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

— যেটা তুই বুঝবি না।

মেঘলা হেসে ফেললেন। অমলেন্দু কাগজ নামিয়ে বললেন,

— আমাদের সময়ে একে দেরি করে ওঠা বলা হতো।

— Language evolves, দাদু।

— আলস্যও evolve করেছে দেখছি।

টেবিল জুড়ে হাসির রোল উঠল। কথাগুলো তুচ্ছ, প্রতিদিনের মতোই সাধারণ। তবু এই ধরনের মুহূর্তই একটা পরিবারের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। মানুষ সাধারণত জীবনের বড় ঘটনাগুলো মনে রাখে, কিন্তু পরে ফিরে তাকালে দেখা যায়, আসল মূল্য ছিল এই ছোট ছোট নিরীহ কথোপকথনগুলোর মধ্যেই।

দুপুরের দিকে অরিন্দম বাড়ির সামনের বাগানে কাজ করছিলেন। কয়েকটা গোলাপগাছের ডাল ছাঁটা দরকার ছিল, আর নতুন লাগানো দুটো গাছের গোড়ায় মাটি আলগা করে দিতে হবে। এই কাজগুলো তিনি মন দিয়ে করেন। মাটি, গাছপালা আর নীরবতা—এই তিনটার মধ্যে এমন একটা শান্তি আছে, যা তিনি জীবনের অন্য কোথাও খুব একটা খুঁজে পান না। বারান্দা থেকে কুমুদিনী কয়েকবার বলে গেলেন রোদে বেশি না দাঁড়াতে, আর অরিন্দম প্রতিবারের মতোই "আর পাঁচ মিনিট" বলে কাজ চালিয়ে গেলেন।

ঠিক সেই সময় তাঁর চোখ রাস্তার ওপারে গিয়ে স্থির হলো।

একটা কালো SUV এসে ধীরে ধীরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রথমে তিনি বিষয়টাকে গুরুত্ব দেননি। এই এলাকায় মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন গাড়ি আসে, কেউ ঠিকানা খোঁজে, কেউ ফোনে কথা বলে, কেউ বা কারও জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু কয়েক মিনিট পরে তিনি লক্ষ্য করলেন, গাড়িটা এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ইঞ্জিন বন্ধ। কাচগুলো কালো। ভেতরে কে আছে বোঝার কোনো উপায় নেই।

অরিন্দমের ভেতরে বহু বছরের পুরনো একটা প্রবৃত্তি নিঃশব্দে মাথা তুলল। কোনো কিছু অস্বাভাবিক লাগলে সেটাকে অবহেলা না করে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তিনি আবার কাজে মন দিলেন বটে, কিন্তু নজরের একটা অংশ গাড়িটার ওপরই রয়ে গেল। প্রায় দশ মিনিট পর SUV-টা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল, তারপর মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল। গাড়িটা চলে যাওয়ার পরও তিনি কিছুক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। শেষ পর্যন্ত নিজের মনেই হালকা হাসলেন। হয়তো অযথাই সন্দেহ করছেন। সমরের ফোনের পর থেকে মাথাটা একটু বেশি সতর্ক হয়ে আছে।



বিকেলের দিকে ঈশা বেরিয়েছিল লেকের ধারে কিছু ছবি তুলতে। বর্ষার পরে লেকের চারপাশের আলো আর রঙ বদলে যায়, আর সেই সময়টা তার খুব প্রিয়। কয়েক ঘণ্টা ঘোরাঘুরির পর ফেরার পথে সে একটা ছোট ক্যাফেতে ঢুকল। জানালার ধারে বসে ঠান্ডা কফিতে চুমুক দিতে দিতে সে ক্যামেরার ছবিগুলো দেখছিল। ঠিক তখনই রাস্তার দিকে তাকিয়ে তার চোখে একটা কালো SUV পড়ল। গাড়িটা ধীরে ধীরে রাস্তা দিয়ে চলে গেল। ঈশা প্রথমে বিশেষ গুরুত্ব দিল না, কিন্তু পরের মুহূর্তেই মনে হলো কোথায় যেন এই গাড়িটাকে আগে দেখেছে। সে কয়েক সেকেন্ড ভাবল, তারপর কাঁধ ঝাঁকাল। হয়তো ভুল করছে। সারাদিনে এত গাড়ি দেখা যায় যে সব মনে রাখা সম্ভব নয়।

সন্ধ্যার একটু আগে সমরের ফোন এল। আগের দিনের মতোই তার গলায় সেই চাপা সতর্কতা ছিল, যদিও কথাবার্তা খুব সংক্ষিপ্ত।

— কোনো নতুন খবর?

অরিন্দম জিজ্ঞেস করলেন।

— বড় কিছু না। তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার জানলাম।

— কী?

— দু-একজন পুরনো লোককে কেউ খোঁজখবর নিচ্ছে।

— কারা?

— এখনও নিশ্চিত নই। তবে ভালো লাগছে না।

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। জানালার বাইরে সন্ধ্যার আলো ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছে।

— সাবধানে থাকো।

— তুমিও।

কলটা শেষ হয়ে গেল, কিন্তু কথাগুলো মাথা থেকে গেল না। অরিন্দম অজান্তেই দুপুরের SUV-টার কথা মনে করলেন। একা ঘটনাটা তুচ্ছ। কিন্তু কখনও কখনও তুচ্ছ ঘটনাগুলোই বড় ছবির অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

রাতের খাবারের পর সবাই যখন নিজেদের কাজে ব্যস্ত, তখন ঋত্বিক বারান্দায় এসে বাবার পাশে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপচাপ রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সে হঠাৎ বলল,

— বাবা, আজ একটা funny জিনিস দেখলাম।

— কী?

— দুপুরে একটা কালো SUV অনেকক্ষণ রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি ভাবলাম কারও বাড়ি খুঁজছে।

অরিন্দম ধীরে ধীরে ছেলের দিকে তাকালেন।

— কতক্ষণ ছিল?

— জানি না। আমি দু-তিনবার জানালা দিয়ে দেখেছি, তখনও ছিল।

— নম্বর দেখেছ?

— না। খেয়াল করিনি।

— হুম।

ঋত্বিক বিষয়টাকে আর গুরুত্ব দিল না। তার কাছে এটা দিনের অসংখ্য ছোট ঘটনার মধ্যে একটা মাত্র। সে কিছুক্ষণ পর ভেতরে চলে গেল। কিন্তু অরিন্দম বারান্দায় দাঁড়িয়েই রইলেন। দুপুরে তিনি নিজে গাড়িটা দেখেছেন। বিকেলে ঈশাও অজান্তে একই ধরনের গাড়ি দেখেছে। সন্ধ্যায় সমর পুরনো লোকদের খোঁজখবর নেওয়ার কথা বলেছে। আলাদা আলাদা করে দেখলে এগুলোর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।

তবু তাঁর অভিজ্ঞতা বলছে, বিপদ কখনও দরজায় কড়া নেড়ে নিজের পরিচয় দেয় না। প্রথমে সে আসে কাকতালীয় ঘটনার বেশ ধরে। তারপর একদিন হঠাৎ বুঝতে পারা যায়, সে অনেক আগেই এসে পৌঁছেছিল।

সেদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অরিন্দম একবার বাড়ির সামনের রাস্তার দিকে তাকালেন। রাস্তা ফাঁকা। সবকিছু স্বাভাবিক।

অন্তত আপাতদৃষ্টিতে।

No comments:

Post a Comment